সাইফুল ইসলাম,নিজস্ব প্রতিবেদক
কানাডার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র টরন্টো এখন পরিণত হয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলায়। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উত্তর আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র উৎসব—টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (TIFF)-এর ৫১তম আসর।
১০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ১০ দিনব্যাপী এ আয়োজনে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশের প্রায় ২৯০টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা-অভিনেত্রী, অস্কারজয়ী নির্মাতা, প্রযোজক, সমালোচক ও দর্শকদের উপস্থিতিতে উৎসব ঘিরে টরন্টোজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
রেড কার্পেটে তারকাদের ঝলক
TIFF-এর অন্যতম আকর্ষণ রেড কার্পেট। টরন্টোর কিং স্ট্রিট ও রয়্যাল অ্যালেক্সান্দ্রা থিয়েটার ঘিরে তারকাদের উপস্থিতি দেখতে ভক্তদের ভিড় জমেছে।
অ্যাকশন তারকা লিয়াম নিসনসহ আন্তর্জাতিক তারকারা বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র ‘দ্য মঙ্গুজ’-এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারে অংশ নেন। একই সময়ে কোরিয়ান পপ তারকা লিসা—ব্ল্যাকপিঙ্কের সদস্য—কে নিয়ে নির্মিত বিশেষ ডকুমেন্টারি ‘অলওয়েজ লালিসা’ নিয়েও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।
অস্কারজয়ী নির্মাতা ড্যানি বয়েলের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘ইনক’, মারিওন কোটিয়ার অভিনীত নতুন ড্রামা এবং এভারেস্টজয়ী টেনজিং নরগে ও এডমন্ড হিলারির গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘টেনজিং’ও উৎসবের আলোচনায় রয়েছে।
ভেন্যু বাড়ায় উৎসবের পরিধি
প্রতিবারের মতো স্কোটিয়াব্যাংক থিয়েটার ও রয় থমসন হলের পাশাপাশি এবার টরন্টোর আরও কয়েকটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মাল্টিপ্লেক্সকে উৎসবের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। দর্শকদের বাড়তি চাপ সামলানো এবং বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
উৎসবকে ঘিরে টরন্টোর হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও বিনোদন খাতেও তৈরি হয়েছে বাড়তি ব্যস্ততা। ফলে TIFF শুধু চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মিলনমেলা নয়, শহরের সাংস্কৃতিক ও পর্যটন অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এশিয়ার সিনেমায় বিশেষ নজর
এবারের উৎসবে দক্ষিণ এশিয়া ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সিনেমা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় ডাকাত রানী ফুলন দেবীর জীবন অবলম্বনে নির্মিত রিচি মেহতার হিন্দি চলচ্চিত্র ‘ফুলন’ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে উৎসব-সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় পর একটি তামিল চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচালক কার্তিক সুব্বারাজের ‘ডোরোথি’ উৎসবের ‘সেন্টারপিস’ বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে। কীর্তি সুরেশ অভিনীত সিনেমাটি প্রদর্শনের পর আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা লি চ্যাং-ডংয়ের সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ‘পসিবল লাভ’ও উৎসবের আলোচিত চলচ্চিত্রগুলোর একটি। চলচ্চিত্রটি নিয়ে সমালোচক ও দর্শকদের আগ্রহ এশীয় সিনেমার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
প্রান্তিক মানুষের গল্পেও গুরুত্ব
গ্ল্যামার ও বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের পাশাপাশি এবারের TIFF-এ সামাজিক বৈষম্য, জলবায়ু সংকট এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংগ্রামের গল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কানাডার আদিবাসী নির্মাতা ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের চলচ্চিত্রকারদের অংশগ্রহণে আলোচনা, সেমিনার ও বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে মূলধারার বাইরে থাকা গল্প ও নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
‘পিপলস চয়েস’ ঘিরে বাড়তি আগ্রহ
TIFF-এর অন্যতম আলোচিত পুরস্কার ‘পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’। বিচারক প্যানেলের পরিবর্তে দর্শকদের ভোটে নির্বাচিত এই পুরস্কার উৎসবটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত।
অতীতে TIFF-এর পিপলস চয়েস পাওয়া বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র পরবর্তী সময়ে অস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে আলোচনায় এসেছে। এ কারণে উৎসবের শেষ দিনে ঘোষিত হতে যাওয়া এবারের পুরস্কারের দিকে হলিউডসহ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের নজর রয়েছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে নতুন সম্ভাবনার বার্তা
সব মিলিয়ে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এখন শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন নয়; এটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক, সমালোচক ও দর্শকদের মধ্যে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম।
মহামারি-পরবর্তী সময় এবং চলচ্চিত্রশিল্পের নানা সংকট কাটিয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গন যখন নতুন সম্ভাবনার দিকে এগোচ্ছে, তখন TIFF-এর এবারের আয়োজন সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। টরন্টোর রেড কার্পেট, প্রেক্ষাগৃহ ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ভেন্যুতে তাই এখন চলছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতার উদযাপন।