পিছু হটলেন ট্রাম্প, অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা

ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কোনও দেশের মধ্যস্থতাকারীরাই দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে পৌঁছাননি

by নিজস্ব প্রতিবেদক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত যেন এক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্নায়ুযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে আলোচনার টেবিলে বসার আগে দুপক্ষই একে অপরকে হুমকি ও তিরস্কারে ভাসিয়ে দিয়েছে। ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম পিছু হটেছেন।

মঙ্গলবার গভীর রাতে ট্রাম্প যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন, তখনও ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কোনও দেশের মধ্যস্থতাকারীরাই দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে পাকিস্তানে পৌঁছাননি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকার দাবিগুলোর ওপর ইরানের নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় দিতেই এই যুদ্ধবিরতি। এটি এমন এক সময় পর্যন্ত স্থায়ী হবে, যতক্ষণ না আলোচনা কোনও একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

ইরানের নেতাদের কাছে এই সিদ্ধান্ত তাদের ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে যে যুদ্ধের কষ্ট সহ্য করার সক্ষমতা ট্রাম্পের চেয়ে তাদেরই বেশি। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চললেও ইরানের নেতারা বিশ্বাস করেন, তারা তাদের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল অবরোধকে ট্রাম্পের চেয়েও দীর্ঘ সময় সহ্য করতে পারবেন। বিপরীতে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে বিশ্ব অর্থনীতি ও ট্রাম্পের রাজনীতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছে, তা তিনি খুব বেশি দিন সহ্য করতে পারবেন না।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্প পরিচালক আলী ওয়ায়েজ বলেন, ইরান তাদের সময়কালকে মাসের হিসাবে পরিমাপ করে, আর ট্রাম্প প্রশাসন ও বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা সপ্তাহের হিসাবে। তাদের ধারণা, ট্রাম্প তিন সপ্তাহের বেশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা সহ্য করতে পারবেন না।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে, যা দিয়ে আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো। এর প্রভাব শুধু তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সার ও গ্যাসের সংকটও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের উচ্চমূল্য ট্রাম্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে অভ্যন্তরীণ সমস্যা তৈরি করছে।

আরো পড়ুনঃ ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের

ইসলামাবাদে গত দফার আলোচনা কোনও ফলাফল ছাড়াই শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন নৌ-অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ইরানের বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে থামিয়ে দেওয়া এবং তাদের তেল রফতানি বন্ধ করা। আলোচনার এই ব্যর্থতার কারণ এখনও অস্পষ্ট। ট্রাম্প এর জন্য ইরানের ‘বিভক্ত’ নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন, যারা আলোচনার আগে একমত হতে পারেনি।

অন্যদিকে ইরানি কর্মকর্তাদের যুক্তি, ট্রাম্প আলোচনার আগে মার্কিন অবরোধ তুলতে অস্বীকার করেছেন এবং সপ্তাহান্তে একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করেছেন বলেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।

মঙ্গলবার রাতে যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে পাকিস্তানে আলোচনার জন্য কেউ যাচ্ছে না, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরানি বন্দর অবরুদ্ধ করা একটি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল এবং তা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।

তিনি আরও বলেন, একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত করা এবং এর নাবালকদের জিম্মি করা আরও বড় লঙ্ঘন। আরাঘচি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কীভাবে নিষেধাজ্ঞা নিষ্ক্রিয় করতে হয়, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হয় এবং গুণ্ডামি প্রতিরোধ করতে হয়, তা ভালো করেই জানে।

যুদ্ধ চলাকালীন ইরান ট্রাম্পের হুমকির মুখে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও উদাসীনতা বোঝাতে ব্যঙ্গাত্মক মিম ও ভিডিও ব্যবহার করেছে। বুধবার সকালে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর ইরানের অনেক আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও প্রকাশ করে। তাতে দেখা গেছে, ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছেন এবং মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা একটি খালি আলোচনার কক্ষে বসে আছেন। কিন্তু কোনও ইরানি প্রতিনিধি সেখানে পৌঁছাচ্ছেন না; বরং তারা একটি কাগজ পাঠিয়েছেন যেখানে লেখা, “ট্রাম্প, চুপ করো।”

আরো পড়ুনঃ নতুন করে লড়াইয়ের আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব মিলানের ইরান বিশেষজ্ঞ আবদোলরাসুল দিভসাল্লার বলেন, আলোচনা শুরু হওয়ার পথে বড় বাধা আগের মতোই রয়ে গেছে, উভয় দেশই মনে করে তাদের হাতেই সুবিধা আছে এবং তারাই শর্ত আরোপ করতে পারবে।

তিনি বলেন, ইরান মনে করে মার্কিন অভিযানকে তাদের উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ করতে পারাটাই তাদের বিজয়। তারা ধরে নিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের হয়তো অন্য কোনও ভালো বিকল্প নেই এবং তারা যদি বর্তমান পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারে, তবে সময় তাদের পক্ষেই যাবে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ইরানের নেতৃত্ব টিকে থাকতে পারলেও তাদের অর্থনীতি হয়তো পারবে না। যুদ্ধের আগেই ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে ছিল। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে যে বিশাল প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা নির্মমভাবে দমন করা হয়। এমনকি ইরানের নেতারা যদি এই অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করেও ফেলেন, তবে তার বিশাল মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানিরা প্রতিদিন বিশাল ছাঁটাই, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অবকাঠামো ধ্বংসের পর ওষুধ ও প্লাস্টিক সংকটের আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন। আলী ওয়ায়েজ বলেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠী শুধু নিজেদের টিকে থাকা নিয়ে ভাবে, জনগণের কষ্ট নিয়ে নয়। তারা এখনও এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক অস্তিত্বের লড়াই হিসেবেই দেখছে। আর ঠিক এই কারণেই, ইরানি জনগণ যতই কষ্ট পান না কেন, শাসকগোষ্ঠী পিছু হটবে না।

You may also like