রবিবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার কাওয়ালিন নাহার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিনের কাগজপত্র কারাগারে এসে পৌঁছালে যাচাই-বাছাই করে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে কারাগার থেকে বের হয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চলে গেছেন তিনি।”
এর আগে দুপুরে জুলাই আন্দোলনের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রাজধানীর লালবাগ থানায় দায়ের করা এক মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন আদালত। আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জামিন মঞ্জুর করেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন।
আদালত ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় মামলায় পুলিশের প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন।
গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) এই মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। ওই দিন ভোরে তাকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান তুললে তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। তাঁকে আদালতের দ্বিতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানোর সময় আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শিরীন আপার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’—স্লোগান দিতে থাকেন।
আরো পড়ুনঃ সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিরীন শারমিনের ছবি ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাকে হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। তাঁর প্রতি যে কোন ধরনের অমানবিক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন না করতে সরকারের প্রতি তারা আহ্বান জানান। এছাড়া প্রতিহিংসামূলক সকল মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিও তোলেন অনেকে।
শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল আইনজীবী স্লোগান তুললে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।
এ সময় আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্যে নিচতলার সিঁড়িতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান শিরীন শারমিন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।
ডিবি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে লালবাগের আজিমপুর সরকারি কলোনি এলাকায় ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণ মিছিল করছিল। এ সময় আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে গুলিবর্ষণ করে। এতে আন্দোলনকারী মো. আশরাফুল ফাহিমের বাঁ চোখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। তিনি গত বছরের ১৭ জুলাই লালবাগ থানায় মামলা করেন।
মামলায় আশরাফুল অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিপ্লব বড়ুয়া, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ সদস্য ও অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করে। এ মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরী ৩ নম্বর আসামি।
১৮ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউন চলাকালে এবং আন্দোলনের অন্যান্য সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাবেক স্পিকার অন্যতম কুশীলব ছিলেন। তার সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনায় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই মামলার সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছে।
গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, বলেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি তিনটি মামলা তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে ডিবি।
সেনানিবাস থেকে ধানমন্ডি
গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ২২ মে আশ্রয় গ্রহণকারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় শিরীন শারমিনের নামও ছিল।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছিল যে, শিরীন শারমিন পদত্যাগ করেছেন। সেদিন স্পিকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্পিকার পদ হতে পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর পদত্যাগ পত্রটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ১৮ ভাদ্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ/২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে গৃহীত হয়েছে এবং উক্ত তারিখে কার্যকর হয়েছে।
স্পিকারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গণমাধ্যমকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা দেড়টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবন থেকে বের হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সপরিবারে একটি সাধারণ প্রাইভেট কারে করে তড়িঘড়ি বের হন তিনি। এ সময় স্পিকারের জন্য বরাদ্দ গাড়ি ও সংসদ সচিবালয়ের পরিবহন পুল থেকে পাঠানো গাড়িও ব্যবহার করেননি। তবে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি কোথায় গেছেন তা বলতে পারেননি তারা।
একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেও স্পিকারের অবস্থান সম্পর্কে এতদিন কিছুই জানা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি কি দেশে নাকি বিদেশে চলে গেছেন।
তবে ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, শিরীন শারমিন এতদিন বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হলে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে টানা তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হককেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানায়।