সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে

সেনানিবাস থেকে ধানমন্ডিঃ ১৭ মাস ধরে আত্মগোপন ও গ্রেপ্তার নিয়ে দিনভর নানা প্রশ্ন

by নিজস্ব প্রতিবেদক
Published: Updated:

আটকের পর ডিবি কার্যালয়ে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী

মঙ্গলবার ভোরে ধানমন্ডির এক আত্মীয়ের বাসা থেকে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের হাতে আটক হন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার। দুপুরের দিকে পুলিশ জানায়, হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুরের ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

দুপুর দুইটায় তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তাকে জেল হাজতে আটকে রাখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন।

শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানা রিমান্ড ও জামিন আবেদন দুটিই নামঞ্জুর করেন এবং শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এ আদেশের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান তুললে তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। তাঁকে আদালতের দ্বিতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানোর সময় আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শিরীন আপার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’—স্লোগান দিতে থাকেন।

পরে তাঁরা সিএমএম আদালতের সামনে এলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরাও পাল্টা স্লোগান দেন। ‘আইনজীবী ফোরামের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘আওয়ামী লীগের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’—এসব স্লোগান দেন তাঁরা।

দুই পক্ষের আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের সিএমএম আদালতের সামনে থেকে সরিয়ে দেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।

আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী কামরুল হোসেন বলেন, ‘জয় বাংলা কি নিষিদ্ধ কোনো স্লোগান? এটি স্বাধীনতার স্লোগান। জয় বাংলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র ছিল। আজ কি এই স্লোগান নিষিদ্ধ হয়ে গেছে?’

এ বিষয়ে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী কৌঁসুলি হারুন-অর-রশীদ বলেন, আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। পরে তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিরীন শারমিনের ছবি ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তাকে হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। তাঁর প্রতি যে কোন ধরনের অমানবিক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন না করতে সরকারের প্রতি তারা আহ্বান জানান। এছাড়া প্রতিহিংসামূলক সকল মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিও তোলেন অনেকে।

 

মামলার তথ্য

ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন। সর্বশেষ তিনি ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ডিএমপির লালবাগ থানার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুরের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

এই মামলার বাদী মো. আশরাফুল। মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও রয়েছেন। শিরীন শারমিন চৌধুরী এই মামলার ৩ নম্বর আসামি।

মামলার অভিযোগ সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ এর ১৮ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে ছাত্র-জনতার একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং মামলার অন্যান্য আসামিদের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ মদদে এই হামলা চালানো হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, পুলিশের সদস্যসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেন। এতে মো. আশরাফুল নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তার বাম চোখ ভেদ করে গুলি রেটিনার পেছনে চলে যায় এবং তিনি স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। ছবিঃ বিডিনিউজ

১৮ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউন চলাকালে এবং আন্দোলনের অন্যান্য সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাবেক স্পিকার অন্যতম কুশীলব ছিলেন। তার সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনায় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে এই মামলার সহিংস ঘটনাগুলো ঘটেছে।

গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, বলেন ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।

গ্রেপ্তারের পর শিরীন শারমিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যও আদালতকে জানায় ডিবি। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি তাঁর নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে এই মামলার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে পলাতক আসামিসহ মামলার ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে যান তিনি।

আসামিকে পুলিশ হেফাজতে এনে নিবিড় ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে পলাতক আসামিদের অবস্থান নির্ণয় করাসহ গ্রেপ্তার এবং মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় ডিবি। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে চিরতরে পলাতক হওয়াসহ মামলা তদন্তে বিঘ্ন ঘটানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

 

সেনানিবাস থেকে ধানমন্ডি

গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকেই সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ২২ মে আশ্রয় গ্রহণকারীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকায় শিরীন শারমিনের নামও ছিল।

২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছিল যে, শিরীন শারমিন পদত্যাগ করেছেন। সেদিন স্পিকারের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্পিকার পদ হতে পদত্যাগ করেছেন এবং তাঁর পদত্যাগ পত্রটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ১৮ ভাদ্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ/২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে গৃহীত হয়েছে এবং উক্ত তারিখে কার্যকর হয়েছে।

স্পিকারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গণমাধ্যমকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বেলা দেড়টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার সরকারি বাসভবন থেকে বের হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। সপরিবারে একটি সাধারণ প্রাইভেট কারে করে তড়িঘড়ি বের হন তিনি। এ সময় স্পিকারের জন্য বরাদ্দ গাড়ি ও সংসদ সচিবালয়ের পরিবহন পুল থেকে পাঠানো গাড়িও ব্যবহার করেননি। তবে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি কোথায় গেছেন তা বলতে পারেননি তারা।

একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেও স্পিকারের অবস্থান সম্পর্কে এতদিন কিছুই জানা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠেছিল, তিনি কি দেশে নাকি বিদেশে চলে গেছেন।

তবে ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, শিরীন শারমিন এতদিন বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন।

আজ মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির ৮/এ রোডের ওই বাসা থেকেই তাকে আটক করা হয়। আটক হওয়া বাসা তার নিজের বলা হলেও স্বজনদের দাবি এটি তার আত্মীয়ের বাসা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হলে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে টানা তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।

২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হককেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা থেকে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানায়।

 

শপথ পড়ানো নিয়ে বিতর্ক

১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেকে ঘিরে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো নিয়ে জটিলতা শুরু হয়।

সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান আগের জাতীয় সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকার বা স্পীকার অনুমোদিত কেউ। তবে স্পিকার না থাকলে ডেপুটি স্পিকার, এবং তিনিও না থাকলে রাষ্ট্রপতি যাকে মনোনীত করবেন, তিনদিন পর তিনি শপথ করাবেন।

অবশেষে, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় (স্পিকারের পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের গ্রেপ্তার), তৎকালীন আইন উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ১৭ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন।

 

সিঁড়িতে পড়ে গেলেন শিরীন শারমিন
শিরীন শারমিনকে হাজতখানায় যখন নেওয়া হচ্ছিল, তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একদল আইনজীবী স্লোগান তুললে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাঁদের সঙ্গে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ধাক্কাধাক্কি হয়।

এ সময় আদালত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্যে নিচতলার সিঁড়িতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান শিরীন শারমিন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে টেনে তোলেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।

তবে ঢাকা সিএমএম আদালতের হাজতখানায় দায়িত্বরত উপপরিদর্শক মো. মোরশেদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি পড়েননি। শেষ সিঁড়িতে এসে তাঁর পা একটু বেঁকে যায়। আমাদের নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁকে চারদিক থেকে ধরে রাখেন। তিনি পড়েননি।’

 

You may also like