প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সংসদ মানেই পুরো বাংলাদেশ এবং এই সংসদের সফলতা মানেই দেশের সফলতা। তাই এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ও প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যদি একটি স্থিতিশীল সরকার ও সংসদ নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে কোনোভাবেই এই দেশকে সামনে নিয়ে যেতে পারব না। সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। তাই সংসদকে অকার্যকর হওয়া থেকে রক্ষা করতে সকল সংসদ সদস্যের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকাল ১১টায় সংসদ অধিবেশন বসে। সন্ধ্যায় সমাপনী বক্তব্য দেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান। রাত ৮টা ২০ মিনিটে সংসদ নেতা বক্তব্য শুরু করেন এবং শেষ করেন ৯টা ১০ মিনিটে।
দেশের বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার দ্রুত উন্নয়নসহ বিভিন্ন জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে সংসদে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও দল-মত নির্বিশেষে ঐক্য ছাড়া দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই সংসদের দিকে সমগ্র বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। পৃথিবীর প্রতিটি কর্নারে যেখানেই একজন বাংলাদেশি আছেন, প্রত্যেকটি মানুষ দৃঢ় প্রত্যাশা নিয়ে এই সংসদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিনি বলেন, আলোচনা, বিতর্ক ও সংলাপ চলবে। তবে কোনোভাবেই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।
আরো পড়ুনঃ লন্ডন বৈঠকেই নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়েছিল, জানালেন মির্জা ফখরুল
অতীতে ১৭৩ দিনের হরতালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সেই সময় দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল, যার প্রভাব এখনো বহন করতে হচ্ছে।
বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “আপনি ব্যর্থ হওয়া মানেই আমি ব্যর্থ হওয়া, আর আমাদের কেউ একজন ব্যর্থ হলে পুরো বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই সংসদ হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দেশের স্বার্থে সবসময় বিরোধী দলের সঙ্গে যেকোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে রাজি আছি। আসুন, আমরা এই সবুজ চেয়ারের পবিত্রতা রক্ষা করি। যে প্রত্যাশা নিয়ে দেশের মানুষ আমাদের এখানে পাঠিয়েছে, তাদের প্রত্যাশা পূরণ করি।”
দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল না থাকলে এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হলে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদে বিরোধী দলের নেতাসহ অধিকাংশ সদস্য নিজ নিজ এলাকার রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্টের চাহিদা তুলে ধরেছেন। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এ অবস্থায় একটি স্থিতিশীল সরকার ও স্থিতিশীল সংসদ নিশ্চিত না করলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দেশের অগ্রগতির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দেশের শিশুদের জন্য একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশের মতো আধুনিক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে আগামী জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ প্রদান কার্যক্রম শুরু হবে। একইসঙ্গে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস এবং জুতার ব্যবস্থাও করা হবে।
আরো পড়ুনঃ সংসদে শৃঙ্খলা মানার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু সহায়তা নয়, বরং শিশুদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার অংশ। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়বে এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই কর্মসূচি সারা দেশে বিস্তৃত করা হবে, যাতে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও আধুনিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়।
শিক্ষা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এসব খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং সেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতেই এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের সন্তানদের জন্য একটি সুন্দর ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং মেয়েদের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ফ্রি শিক্ষা ও ভালো ফলাফলের জন্য উপবৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ কিছুটা কষ্টের সম্মুখীন হয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি ও অন্যান্য সংকটের সমাধানে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে যৌথভাবে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও খাল সমস্যার বিষয়ে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ দুই দিন দেশে লোডশেডিং ছিল না, বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ
সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক এবং দ্রুত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারী বর্ষণ ও বন্যায় বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগাম প্রস্তুতি নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার সবসময় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা হয়েছে। এই উদ্যোগ শুধু সেচ নয়, বরং পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক পানিসংকটে পড়বে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বড় অংশ বিনিয়োগ করা হবে, যাতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা যায়।
আরো পড়ুনঃ ইউনূস আমলের চুক্তির আওতায় ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করলো বিমান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির সম্মানী প্রদানে বিরোধী দলীয় নেতার প্রস্তাব সমর্থন করেন প্রধানমন্ত্রী।
৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশকে সুশৃঙ্খল রাখার ক্ষেত্রে সশন্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তাদেরকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন, আমরা এই সবুজ চেয়ারের পবিত্রতা রক্ষা করি। যে দায়িত্ব, যে প্রত্যাশা, যে আশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে, আসুন আমরা সেই দায়িত্বের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করি। এর মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে। কারণ দেশ ও জনগণ থাকলেই আমরা আছি। দেশ ও জনগণকে যদি আমরা সম্মান না করি, তাহলে আমাদের রাজনীতিই ব্যর্থ হয়ে যাবে। সেজন্য আমাদের সবচেয়ে প্রথম হচ্ছে এই দেশের জনগণ ও প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।”