গত ২২ এপ্রিল কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর হিন্দু মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধু’র অর্ধদগ্ধ ও ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটি জনায়, এই নৃশংস ঘটনাটি মানবাধিকার, আইনের শাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার ওপর একটি গুরুতর আঘাত। একজন ধর্মীয় পুরোহিতের এই ভয়াবহ মৃত্যু সমাজে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করেছে।
এক বিবৃতিতে জেএমবিএফ জানায়, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে জীবন, স্বাধীনতা, সমতা, নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়, পেশা বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে যেকোনো ধরনের আক্রমণ, অপহরণ, নির্যাতন বা হত্যা এই মৌলিক অধিকারগুলোর সরাসরি লঙ্ঘন। একইভাবে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলসমূহ—বিশেষ করে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি—সকল ব্যক্তির জীবন, নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বৈষম্যহীনতার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়।
যদি নয়ন সাধুর মৃত্যু একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে লক্ষ্যবস্তু করে চালানো হামলা, অথবা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর চেষ্টার ফল হয়ে থাকে, তবে এটি মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রতি একটি সরাসরি হুমকি। অতএব, এই ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা, অপরাধী এবং যেকোনো সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপট অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। জেএমবিএফ মনে করে যে, তদন্তে বিলম্ব, অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও গভীর করে এবং অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
আরো পড়ুনঃ নারী শিক্ষককে জুতাপেটা করার ঘটনায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার
জেএমবিএফ–এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম বলেন: “একটি সভ্য সমাজে নয়ন সাধরের ওপর এই নৃশংসতা অকল্পনীয়। এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার ওপর একটি সরাসরি আক্রমণ। যদি রাষ্ট্র প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে, যা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করবে। আমরা স্পষ্টভাবে বলছি যে, একটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।”
আট দফা দাবি জানিয়ে জেএমবিএফ জানায়, ঘটনাটির একটি দ্রুত, নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে; ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক প্রমাণ, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে; অপরাধের সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধী, পরিকল্পনাকারী এবং সহযোগীদের শনাক্ত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে; ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ধর্মীয় উগ্রবাদ, নাকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছিল, তা তদন্ত করতে হবে; ভুক্তভোগীর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আইনি সহায়তা, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে; স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়, মন্দির এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে; তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় যেন কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক অবহেলা বা প্রমাণ ধ্বংস না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে; এবং মামলাটির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিবৃতিতে জেএমবিএফ স্পষ্টভাবে জানায় যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহের বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অবশ্যই সমানভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে।
এছাড়া জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই নৃশংস ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সোচ্চার হতে এবং পদক্ষেপ নিতে জেএমবিএফ আহ্বান জানাচ্ছে।