আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে “ব্লক রেইড” অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বাসস’কে বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্লক রেইড অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ও অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
এছাড়া, দেশে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ডিএমপি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে সারা দেশে ৮৫৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০টি এবং মার্চে ৩১৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
একই সময়ে রাজধানী ঢাকায় মোট ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি এবং মার্চে ৩৩টি খুনের ঘটনা ঘটে। চলতি এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনেই রাজধানীতে অন্তত ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে এবং পুলিশের ২৪ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়।
আরো পড়ুনঃ ৩ মাসে ৮৫৪ হত্যাকাণ্ড, ঢাকায় ১০৭
সম্প্রতি ডিএমপি’র তেজগাঁও বিভাগের অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ৫৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় মোহাম্মদপুর, শের-ই-বাংলা নগর, আদাবর, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও হাতিরঝিল থানার অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে “ব্লক রেইড” অভিযান চালানো হয়।
ডিএমপি’র তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ মাসে রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৯ হাজার ২৫৯ জনকে গ্রেফতার এবং ১ হাজার ৩০৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া মার্চে রাজধানীর ১১টি থানা বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজার ৬২৫ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা ৬৭৪, হাজারীবাগ ৪৯৪, নিউমার্কেট ৫১, মিরপুর ৪৬৯, শাহবাগ ১৫৯, বংশাল ১৩২, লালবাগ ১২৮, উত্তরা পশ্চিম ২৩৪, ধানমন্ডি ৬৭, বাড্ডা ১১৫ এবং মতিঝিল থানা ১০২ জনকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, ধারাবাহিক অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং পুলিশ-জনগণের সমন্বিত সহযোগিতার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে যথেষ্ট ভালো।”
তিনি বলেন, “অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্ত করা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।”
ডিএমপি’র গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা আরও উন্নত করতে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি যথেষ্ট ভালো, তবে আরও উন্নত হবে।
আরো পড়ুনঃ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ১৩ কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে, ২৪ জনকে বদলি
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) খুন, অর্থপাচার, সাইবার অপরাধ, জালিয়াতি, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণসহ বিশেষায়িত ক্ষেত্রে কাজ করছে। সিআইডি এসব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তৎপর রয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিভিন্ন অপরাধে ৭ জনকে গ্রেফতার এবং ৬টি মামলা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২টি মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত।
এছাড়া, র্যাব আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, দালাল চক্র ও ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে।
র্যাবের মিডিয়া শাখা থেকে জানানো হয়, ফেব্রুয়ারিতে ৬২৭ জনকে গ্রেফতার ও ৪৪টি মোবাইল কোর্ট এবং মার্চে ৮৫২ জনকে গ্রেফতার এবং ৯৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
এদিকে, সীমান্তে চোরাচালান, মাদক, নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে বিজিবি। জরুরি পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সহায়তা দিচ্ছে।
বিজিবি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের মার্চে অভিযান চালিয়ে ১৬৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ তনু হত্যা মামলাঃ ১০ বছর পর গ্রেপ্তার, ৩ দিনের রিমান্ডে সাবেক সেনাসদস্য
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। গত মার্চে বিভিন্ন অপরাধে ৬৭৩ জনকে গ্রেফতার এবং ৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। সম্প্রতি আসাদুল হত্যা মামলার আসামিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের দমনে আমরা তৎপর রয়েছি। মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় সন্ত্রাসীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।”
নিউমার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে একাধিক টিম কাজ করছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ধানমন্ডি থানার ওসি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। ধানমন্ডি থানা এলাকায় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছে।”
বাড্ডা থানার ওসি কাজী মো. নাসিরুল আমিন বলেন, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আইন মেনে সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এলাকায় পরিস্থিতি ভালো। তবে তা আরও উন্নয়নে কাজ চলছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে।