২০২৫ সালের ১২ মে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। একইদিন নির্বাচন কমিশন দেশের সর্ববৃহৎ দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।
আগের সরকারের সেই পথ ধরে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
এর ফলে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে। তবে, দলটি চাইলে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রমে ফিরতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, খবর বাংলা ট্রিবিউনের।
২০২৫ সালের ১১ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনে জারি করা অধ্যাদেশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন সংসদ কার্যকর না থাকায় আইনটি অধিকতর সংশোধন করে আশু ব্যবস্থা নিতে সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। যার ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত “সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল” পাস হয়। কিন্তু, পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি।
আরো পড়ুনঃ সংসদে বিল পাস, আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ
এ অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের কার্যক্রমে ফিরে আসতে চাইলে আইনি পথ অনুসরণ করতে পারেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মামুন মাহবুব। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে নয়, তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। তারা কার্যক্রমে ফিরতে চাইলে তাদের সামনে আইনগত পদক্ষেপ হচ্ছে উচ্চ আদালতে রিট করা। সেই রিটে তাদের অনেক যুক্তি থাকতে পারে।”
“একপাক্ষিক সংসদে একপেশে” বিল পাসের মধ্য দিয়ে নিষিদ্ধের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
“এই ধরনের সিদ্ধান্ত কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ নয়; বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা, সুষ্ঠু রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের পথ বেয়ে গড়ে ওঠা গণমানুষের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ গণতন্ত্রের মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রকে একদলীয় বা স্বৈরতান্ত্রিক ধারার দিকে ঠেলে দেয়। একই তা ইতিহাসের প্রতি রক্তচক্ষু দেখানো। যা দেশের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।“
বিবৃতিতে দেশের সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং তরুণ প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে শামিল হতে আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদেরকে ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে বলা হয়েছে।
কি আছে আইনে?
এ সংক্রান্ত পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে।
আরো পড়ুনঃ জুলাই আন্দোলনকারীদের দায়মুক্তি দিলো জাতীয় সংসদ
বিলে আরও বলা হয়েছে, উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনও মাধ্যমে কোনও ধরনের প্রচারণা অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসমক্ষে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করবে।
মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিল পাস করে দলটির (আওয়ামী লীগ) কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূলত, আইন দিয়ে তো এসব নিষিদ্ধ করা যায় না। নাগরিকদের তার পছন্দমতো সংগঠন করার সুযোগ সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এই আইন যখন আদালতে যাবে, তখন এটি বাতিল হবে। আইন করে এভাবে সংগঠন নিষিদ্ধ সরকার করতে পারে না।”
আরো পড়ুনঃ অকার্যকর হলো ইউনূস সরকারের ২০ অধ্যাদেশ
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের “সংগঠনের স্বাধীনতা” মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ বলা রয়েছে, “জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোনও ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করার কিংবা এর সদস্য হওয়ার অধিকার থাকবে না, যদি-(ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করার উদ্দেশে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনও দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থি হয়।”
সমাধান কোন পথে?
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, “এখানে আদালতের ক্ষমতা আছে মৌলিক অধিকার পরিপন্থি বা লঙ্ঘন হলে হস্তক্ষেপ করার। সেটা আদালতে গেলে (রিট দায়ের করলে) তা বাতিল হয়ে যাবে। একমাত্র কোনও দল বা সংগঠন যদি রাষ্ট্রদ্রোহীতামূলক কাজ করে, তবেই তাদের নিষিদ্ধ করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এক অস্বাভাবিক সময়ে নিষিদ্ধ করেছিল, তখনকার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু, সেটা এখন করা ঠিক না। তাহলে এর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে ভালো সুফল বয়ে আনবে না।”
অ্যাডভোকেট মামুন মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুটি দলে যোগ-বিয়োগ করে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এদের পক্ষেই থাকে, ঘুরেফিরে ভোট দেয়। তাই বিএনপি সরকার চাইলে তাদের সিদ্ধান্ত (আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের) রিভিউ করতে পারে।