‘সন্দেহজনক হাম’ বা হামের উপসর্গ নিয়ে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে একজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ২১ শিশু এবং সন্দেহজনক হামে ১২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সব মিলিয়ে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পর্যন্ত মোট শিশুমৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৪৯।
চলতি বছর হামে যে সংখ্যক শিশু মারা গেছে, তা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সময়ে মাত্র পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল ২০১৭ সালে, ১০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, মৃত ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই ঢাকা বিভাগের। বাকি দু’জন রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে মারা গেছে।
সোমবার থেকে ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে ৬৪১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ২২৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে (২৫৬ জন), এরপর যথাক্রমে চট্টগ্রাম (১২৫), রাজশাহী (৯২), খুলনা (৬৫), বরিশাল (৫০), সিলেট (২১), রংপুর (১৭) ও ময়মনসিংহ (১৫)।
একই সময়ে ৫৮৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
আরো পড়ুনঃ রাজশাহী মেডিকেলে এক মাসে ৯১ শিশুর মৃত্যু
সোমবার থেকে ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে ১ হাজার ২৩৬ জন হাসপাতালে এসেছে। গত ২৪ দিনে মোট ৯ হাজার ৮৮৩ শিশু হাসপাতালে এসেছে, যাদের মধ্যে ৬ হাজার ৮৮৩ জন ভর্তি হয়েছে এবং ৪ হাজার ৬৩৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
আক্রান্তদের বেশিরভাগই দুই বছরের নিচে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স দুই বছরের নিচে এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসেরও কম। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ২০২২ সালের ১.৪১ থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৬.৮ হয়েছে।
সংস্থাটি মূল কারণ হিসেবে টিকার আওতার বাইরে থাকা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে। বিশেষ করে যেসব শিশু গত দুই বছরে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
টিকা সংকটের দায় ইউনূস সরকারের: জাহেদ উর রহমান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনায় গাফিলতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, আগের সরকারের গাফিলতির কারণেই হামের টিকার সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “টিকাজনিত যে সংকট হয়েছিল, সেটা আসলে আমাদের ওপর এসে পড়েছে। এটার মধ্যে যে সমস্যা ছিল, এটা আগের সরকারের সময়ে হয়েছে। আমরা এখন খুব গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি।”
আরো পড়ুনঃ জ্বালানি তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবে দাম বাড়তে পারে মে মাসে
টিকা কার্যক্রমের সময়সূচি
– ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
– ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশালে টিকা দেওয়া হবে।
– ৩ মে থেকে সারাদেশে একযোগে টিকা কার্যক্রম চলবে।
– লক্ষ্য: ২১ মে-এর মধ্যে ঈদুল আজহার আগেই পুরো কার্যক্রম সম্পন্ন করা।
সরকার আরও ব্যবস্থা নিয়েছে— সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু, স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল এবং জেলা-উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে
জাহেদ উর রহমান বলেন, “শুরুতে বলেছি, এটা আমাদের অবহেলা বা সংকট নয়। কিন্তু মর্মান্তিক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের শিশুরা মৃত্যুবরণ করছে। দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি না হয়, সে জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
‘দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু’
একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হামের টিকা শুরুর পর দেশে এত সংখ্যক মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, “আমি যতটুকু অনুমান করতে পারি, দেশে হামে এ পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে এত রোগীর মৃত্যু হয়নি।”
হামে মৃত্যুর রেকর্ড যা বলছে
টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, এর আগে ২০১৬ সালে একজন, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১০ ত্রিপুরা শিশু এবং ২০২০ সালে বান্দরবানে ৭ শিশু হামে মারা যায়। এবারের মৃত্যু সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা দেখা জরুরি। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে ২০০৪-২০০৫ সালে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও পরবর্তী বছরগুলোতে আক্রান্ত কমে আসে। তবে ২০১১ সালে আবার বেড়ে যায়। ২০১৬ সালেও প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারই চলতি বছর হাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। সেখান থেকে দেশ পিছিয়ে গেল।”