প্রায় পাঁচ বছর আগে ঢাকার কলাবাগানে বন্ধুর বাসায় মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ও লেভেলের ছাত্রীর মৃত্যুর আলোচিত সেই ঘটনায় করা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি।
মামলার ৫৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের জবানবন্দি নেওয়ার তথ্য দিয়ে ওই কিশোরীর বাবা বলেছেন, মামলা নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আর কোনো দিকে মনোযোগ দিতে পারছেন না।
২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি দুপুরে ওই কিশোরীকে তার ছেলে বন্ধু অসুস্থ অবস্থায় কলাবাগানের আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দেয়। তখন লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় তারা।
সেদিন পুলিশ জানিয়েছিল, নিজের বাসায় ‘গ্রুপ স্টাডির’ কথা বলে ওই কিশোরী তার বন্ধুর বাসায় গিয়েছিল। তার বন্ধুর বাসায় ওই সময় আর কেউ ছিল না। ওই বাসা থেকে বেশ কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে, যেখানে শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মিলেছে। ওই কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
ওই দিন রাতেই বন্ধু ইফতেখান ফারদিন দিহানকে আসামি করে কলাবাগান থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে কিশোরীর মা কর্মস্থলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন। এর এক ঘণ্টা পর তার বাবাও ব্যবসায়িক কাজে বের হন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ওই ছাত্রী তার মাকে ফোন করে কোচিং থেকে পড়ালেখার জন্য কাগজপত্র আনার কথা বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।
আসামি দিহান আনুমানিক দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে ফোন করে ওই শিক্ষার্থীর মাকে জানান, মেয়েটি তাদের বাসায় গিয়েছিল। হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়ায় তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
অফিস থেকে বের হয়ে দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে ওই কিশোরীর মা হাসপাতালে পৌঁছান। হাসপাতালে গেলে তিনি জানতে পারেন, দিহান তার কলাবাগানের ডলফিন গলির বাসায় ডেকে নিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেন। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে অচেতন হয়ে পড়লে দিহান নিজেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক মেয়েটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলায় বলা হয়, পরদিন ময়না তদন্তে কিশোরীর জননাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আলামত পান চিকিৎসক। এই রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর কারণ।
পরে ঘটনার দায় ‘স্বীকার’ করে দিহান আদালতে জবানবন্দি দেন। তিনি এখন কারাগারে আছেন।
একই বছরের ৮ নভেম্বর দিহানকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক খালেদ সাইফুল্লাহ।
২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭।
বিচার শুরুর পর থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সাক্ষী হাজির করে বিচার শেষ করার কথা বলেছিল প্রসিকিউশন।
সে বছর ৩১ মার্চ থেকে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ৫৫ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৯ মে যে বাসায় ঘটনা ঘটে ওই বাসার নিরাপত্তারক্ষী মোতালেব সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। জেরার মধ্যে দিয়ে গত বছরের ১৭ জুলাই শেষ হয়।
সবশেষ গেল ১১ মে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক খালেদ সাইফুল্লাহ সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসেন। তবে বাদীপক্ষের আবেদনে আদালত তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য না নিয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্যের দিন ৩০ জুন রাখেন।
মামলার বাদী ও তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মামলার ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক সাক্ষ্য দিতে না আসায় বিচার কাজ ঝুলে আছে।
বাদী বলেন, “কী আর হবে। দেশের যে অবস্থা, তাই হচ্ছে। ‘টাইম লস’ আর ‘টাইম লস’।”
মামলায় বেশ কয়েকজনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক সোহেল মাহমুদকে সাক্ষ্য দিতে সমন দেওয়া হয়েছিল। তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলেন, তিনি সশরীরে আদালতে আসতে পারবেন না। অনলাইনে সাক্ষ্য দিতে চান। কিন্তু আদালতে এর ব্যবস্থা নেই। তিনিসহ তিন/চারজন সাক্ষীর কারণে মামলার বিচার কাজ শেষ হচ্ছে না।
ওই কিশোরীর বাবা বলেন, “মামলায় অনেক কিছু চলছে। দৌড়াতে দৌড়াতে আমি শেষ।”
আগের বিচারক প্রতি মাসে শুনানির তারিখ রাখতেন তুলে ধরে তিনি বলন, এখন দুই/তিন মাসের একজন শুনানির তারিখ হয়।
বিচার কাজে দেরি হওয়ার আরেকটি কারণ তুলে ধরে বাদী বলেন, “অভিযোগপত্রে সাক্ষী বেশি দেওয়া হয়েছিল। আমরা কাটছাঁট করেছি। এটা একটা মর্মান্তিক ঘটনা ছিল। মামলাটার বিচার দ্রুত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
“রামিসার (পল্লবীতে ধর্ষণের পর হত্যা) মামলার বিচার তো দ্রুত শেষ হয়ে গেল। আমাদের মামলা তো অনেক দিন হল। আমাদের মামলার বিচারটা যেন দ্রুত শেষ হয়। সরকার যেন মামলাটিতে নজর দেয়।”
তিনি বলেন, “মেয়েটা চলে যাওয়ার পর যে ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতি হচ্ছে এখন। মামলা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের দিকে নজর দিতে পারছি না। ব্যবসায় মন দিতে পারছি না। এটা যে কত যন্তণা দিচ্ছে। মামলাটা শেষ হলে সবদিকে মন দিতে পারতাম।”
ওই কিশোরীর বাবা বলেন, “মেয়েটার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। আফসোস করা ছাড়া কিছু করার নেই। কী করা যায়, আর পারতেছি না। মামলাটা শেষ হওয়া দরকার। আর টানতে পারছি না। সময় লাগতেছে, আর ধৈর্য রাখতে পারছি না। এটা টানতে টানতে নিজেও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। একটা কিছু করা দরকার।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “মামলাটি শেষ করার বিষয়ে তাড়া আছে। চেষ্টা করছি দ্রুত শেষ করার। তবে কয়েকজন সাক্ষী না আসায় বিচার শেষ হচ্ছে না। আমরা প্রসিকিউশনের দায়িত্বে আসার পর মামলাটিতে বরাবরই গুরুত্ব দিয়ে আসছি।”
বিচার কাজে কেন দেরি হচ্ছে? জবাবে তিনি বলেন, “মামলায় সাক্ষী অনেক বেশি। আবার আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে গেছে। এ বছর মামলার বিচার শেষ করার চেষ্টা করব।”
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দায়িত্বে ছিলেন আফরোজা ফারহানা আহমেদ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটা বেশ আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ গঠনের পর বাদীর সহযোগিতার মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে সাক্ষী হাজির করেছি। আমরা দায়িত্বে থাকাকালে অনেক সাক্ষী নিয়েছি। মাসে মাসে তারিখ পড়ত। মামলাটা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতাম। স্পর্শকাতর মামলা বিশেষ করে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা মামলা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। মামলাটা তো শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।”
এক প্রশ্নে আফরোজা ফারহানা বলেন, “অনেক সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছি। তবে আমাদের কোর্টে অনেক দিন বিচারক ছিলেন না। এ কারণে কিছু বিলম্ব হয়েছিল। ফোন করে সাক্ষীদের আদালতে নিয়ে আসতাম।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী দীপ্তি সিকদার বলেন, “মামলার সাক্ষ্য শেষের দিকে। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসককে সাক্ষ্যের জন্য সমন দেওয়া হলেও অসুস্থতার কারণে আসতে পারছেন না। তিনি ভার্চুয়ালি সাক্ষ্য দিতে যান। কিন্তু ওই আদালতে এমন ব্যবস্থা না থাকায় তা হচ্ছে না।”
এই আইনজীবী বলেন, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সাক্ষ্য দেওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন। এরপর দুই/তিন জনের সাক্ষ্য নিলে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়ে যাবে।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আসামিরা উচ্চ আদালতে গেছেন। সেখানে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। আবার সাক্ষী পেতে সময় লাগে। বাদীপক্ষ থেকে মামলা শেষ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য শেষ হলে তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন। আশা করছি, দ্রুত মামলার বিচার কাজ শেষ হবে। আসামির সর্বোচ্চ সাজা হবে।”
আসামি দিহানের আইনজীবী বোরহান উদ্দিন বলেন, সাক্ষ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে তাকে নির্দোষ প্রমাণে চেষ্টা করবেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী ইশতিয়াক হোসেন জনি বলেন, বাদী আদালতকে বলেছে যে তদন্ত কর্মকর্তা যেন সবার শেষে সাক্ষ্য দেন। এজন্য আদালত তার সাক্ষ্য গ্রহণ করেননি।
তিনি বলেন, “আসামির পক্ষে তার আইনজীবী উচ্চ আদালতে যান জামিনের জন্য। তবে আদালত আসামিকে জামিন না দিয়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেন। বিলম্ব হলে আসামির জামিনের বিষয় বিবেচনা করতে বলেন।”