মোস্তফা ফিরোজের সাক্ষাৎকারঃ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ আইন বুমেরাং হবে

করোনাকালে ডিজিএফআইয়ের চাপে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়, থাকতেন গ্রেপ্তার আতঙ্কে

by নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ। সমসাময়িক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে টেলিভিশন টকশোতে সুপরিচিত মুখ। জনপ্রিয় বাংলা নিউজ অ্যানালাইসিস প্ল্যাটফর্ম “ভয়েস বাংলা”র সম্পাদক তিনি।

এর আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের বার্তাপ্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউর প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা ফিরোজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে লেখাপড়া সম্পন্ন করেন।

এশিয়া পোস্টের আলাপনে তিনি দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, সরকারি দলের ফ্যাংশন এবং বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আজম।

 

বেড়ে ওঠার গল্প: সাধারণ সাংবাদিকের লড়াই

মোস্তফা ফিরোজ বলেন, “আমি খ্যাতিমান হিসেবে গড়ে উঠিনি। সাধারণ একজন মানুষ ও সাধারণ সাংবাদিক হিসেবে গড়ে উঠছি।” তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী হতে হয়েছে। কলেজ জীবন শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সময় এরশাদের স্বৈরশাসনের মুখোমুখি হন। পুরো শিক্ষাজীবন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন। লেখাপড়ার শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন।

নব্বইয়ের দশকে সেলিম দেলোয়ার ও রাউফুন বসুনিয়ার মৃত্যু কাছ থেকে দেখেছেন। সরকারি চাকরি সম্ভব মনে করেননি। সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময় দেখেন অধিকাংশ সহপাঠী সরকারি চাকরিতে চলে গেছেন, কিন্তু তিনি পত্রিকায় যোগ দেন। সর্বশেষ পত্রিকা ছিল “ভোরের কাগজ”। পরে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট চ্যানেল একুশে টিভিতে যান। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চ্যানেল বন্ধ হয়। এনটিভিতে যাওয়ার পর দুর্ঘটনায় আগুন লাগে। মন ভেঙে গেলেও বাংলাভিশনে ১২ বছর টানা কাজ করেন। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ফ্যাসিবাদের শিকার হন। করোনাকালে ডিজিএফআইয়ের চাপে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। গ্রেপ্তার আতঙ্কে থাকতেন। মিডিয়ায় নিষিদ্ধ হয়ে পড়েন।

তখন “ভয়েস বাংলা” শুরু করেন। ছয় মাসের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ দেখতে শুরু করে। সাংবাদিকতার বাইরে যাননি। করোনা শিথিল হলে দেশের বাইরে চলে যান। দুবাইয়ে কিছুদিন থেকে মালয়েশিয়ায় যান, সেখানে এম্বাসির নজরদারিতে পড়েন। অবশেষে ব্যাংককে চলে যান। হাসিনা সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট দেশে ফেরেন।

 

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: অপতথ্য দমনে সক্ষমতা ও স্বীকৃতির প্রশ্ন

মোস্তফা ফিরোজ মনে করেন, গত এক-দেড় বছরে এশিয়া পোস্ট, দ্য পোস্ট, চর্চা, আলাপসহ অনেক আধুনিক অনলাইন গণমাধ্যম গড়ে উঠেছে। এগুলো তাঁর প্ল্যাটফর্মের চেয়ে অনেক শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও প্রতিশ্রুতিশীল। উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত অবদানই মূল। সরকার বা সাংবাদিক সংগঠনের কোনো সাপোর্ট নেই।

সাংবাদিকদের সেল্ফ-প্রটেকশন ও ইউনিটি দরকার। এখন মিডিয়ার সুসময় মনে হলেও ছয় মাস বা এক-দেড় বছর পর কী হবে জানা নেই। তারেক রহমান সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। প্রশাসনিক শক্তি নিষ্ঠুর ও দখলদারিত্বের পেছনে ছোটে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া অর্থনৈতিক সংকটে সংকুচিত হয়ে ফেসবুক-গুগলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে গুজব কমছে। আগে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়াকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন, এখন ডিজিটাল মিডিয়ার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। টেলিভিশনের চেয়ে অডিয়েন্স অনেক বড়। পাঁচ-ছয়টা টেলিভিশন ছাড়া অন্যরা বেতন দিতে পারে না।

 

গণমাধ্যমের ভূমিকা: ক্ষমতার তল্পিবাহক নাকি সমাজের দর্পণ?

তিনি বলেন, গণমাধ্যম মালিকপক্ষের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়িক গ্রুপকে। অধিকাংশ মিডিয়া পেশাদার সাংবাদিকের হাতে নয়। মালিকরা টেলিভিশন-পত্রিকা দিয়ে নিজেদের অন্যায়-অনিয়ম, ভূমিদস্যুতা, ব্যাংক খেলাপি ঋণের প্রটেকশন নিয়েছে। প্রধান নির্বাহী বা সম্পাদককে এমন বেছে নেওয়া হয়েছে যিনি সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখে মালিকের তদবির করতে পারেন। মোট সাংবাদিক সমাজকে ব্যবহার করা হয়েছে। পেশাদারত্ব মাত্র ১০-২০ শতাংশ, বাকি ৮০ ভাগ অপসাংবাদিকতা। সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো স্বাধীন ও মুক্ত, সম্ভাবনা অনেক বেশি।

 

জ্বালানি সংকট: সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়

বিশ্বজুড়ে ইরানকেন্দ্রিক সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজারে পড়ছে। মোস্তফা ফিরোজ বলেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা আছে, কিন্তু সরাসরি সরকারকে দোষ দেওয়া যায় না। মানুষ পেট্রোল পাম্প থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তরে মজুত করছে। এতে সংকট তৈরি হয়েছে। সংকট ভাঙতে সময় লাগবে। যুদ্ধ শেষ হলেও তাৎক্ষণিক স্বাভাবিক হবে না। সরকার মজুতদারি ও সমবণ্টন ম্যানেজ করতে পারছে না। দেশে করাপশন বেশি। তিনি বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখেছেন, এমন সংকট অন্য কোথাও নেই। নেপালেও স্বাভাবিক অবস্থা। এটা গবেষণার বিষয়।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: মিক্সড অবস্থা

নির্বাচন একদম খাঁটি বা একদম জাল নয়, মিশেল অবস্থা। আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপির বিশাল ভোটব্যাংক ছিল। কিন্তু ১৮ মাসে বিএনপির ক্ষতি হয়েছে। জামায়াত শেষের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের উগ্রবাদী কথাবার্তা ও এনসিপির জামায়াতমুখী হওয়ায় জামায়াত প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানির কারণে জামায়াত এই বদনাম ক্যাপিটাল করছে। প্রশাসনের মৌন সমর্থন বিএনপির দিকে ছিল। কিছু ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ আছে।

 

ডিপ স্টেট: কাল্পনিক নয়, বাস্তবতা আছে

বাংলাদেশে ডিপ স্টেট কাল্পনিক নয়, বাস্তবতা আছে। ওয়ান-ইলেভেন আমেরিকা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত। ইউনূস সরকারের সময়ও সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমা শক্তির প্রভাব ছিল। পাকিস্তানের ইমরান খানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হলে ডিপ স্টেটের প্রভাব বাড়ে। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান না, তবে কিছু ফলাফল অস্বাভাবিক (যেমন নাহিদ ইসলামের জয় বিস্ময়কর, হাসনাত আব্দুল্লাহর জয় সঠিক মনে হয়)। সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা না থাকলে ডিপ স্টেট ঘাঁটি গেড়ে বসবে।

 

অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচনের বৈধতা

গণঅভ্যুত্থান সংবিধান মেনে হয় না। জনগণের শক্তিই আসল। সুপ্রিম কোর্ট ১০৬ ধারায় রেফারেন্স দিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধও অসাংবিধানিক ছিল না। মুজিবনগর সরকারের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। ইউনূস সরকার অবৈধ নয়।

 

ইউনূস সরকারের ১৮ মাস: হাসিনার ১৫ বছরের চেয়ে বড় বিভীষিকা

ড. ইউনূসকে সবাই মনোনীত করেছিলেন, কিন্তু তিনি আশাভঙ্গ করেছেন। সংস্কারের নামে লম্বা সময় নিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি, অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, জুলাই হত্যাকাণ্ডে ১৪০০ মৃত্যু, মিথ্যা মামলা, গোপন চুক্তি, চট্টগ্রাম বন্দর চুক্তি, মবের উত্থান, মাজার ভাঙচুর, ৩০০ মানুষ হত্যা। ৩২ নম্বরে হামলা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা। ৭২-এর সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা মুক্তিযুদ্ধ ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। ইউনূস এটা অনুধাবন করতে পারেননি বা নীরব ছিলেন।

 

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ: বুমেরাং হবে

বিএনপির স্ববিরোধিতা। তারা দল নিষিদ্ধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না বললেও করেছেন। ২০টি অধ্যাদেশ মানেননি। বিএনপির ভোট শুধু নিজেদের নয়, আওয়ামী লীগের ভোট, গণতান্ত্রিক শক্তি, সংখ্যালঘু সবাই ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। এটা বুমেরাং হবে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ১০-২০-৫০ বছর পর অন্য দল এসে আরও দল নিষিদ্ধ করবে।

ভারতের বক্তব্য কূটনৈতিক চাতুর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনা রাজনৈতিক রিফিউজি হলে ভারত আইনত আশ্রয় দিতে বাধ্য। তাঁকে জোর করে ফেরত দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। তিনি রাজনৈতিক বয়ানে খুনি বলা হলেও প্রমাণসাপেক্ষ। সম্ভবত নেগোসিয়েশন হবে—তিনি নীরব থাকলে বিএনপি সরকার মাথা ঘামাবে না।

You may also like