গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর এলাকায় ফেসবুকে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সাতটি আইডি (তিনটি পেজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি) থেকে ভিডিওটি পোস্ট ও শেয়ার হয়। পুলিশ বলছে, শনিবার সকাল পর্যন্ত ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মেসেঞ্জার ও আইডিতে এটি ছড়িয়ে পড়ে।
ফেসবুক উস্কানি ও পুলিশের প্রস্তুতি
সকাল ৯টার দিকে ভিডিওর লিংকগুলো পুলিশ কর্মকর্তার নজরে আসে। পুলিশ ফিলিপনগর এলাকার স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। একজন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা জানান, দরবারে তেমন কোনো বিষয় নেই, তবে আসরের নামাজের পর ইউনিয়নের কিছু মুসল্লির বৈঠক হবে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন, ওই নেতার কথায় সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ একাধিক টিম ফিলিপনগর গ্রামে টহল দিতে শুরু করে এবং বেলা ১১টার দিকে দরবারেও পুলিশ সদস্য উপস্থিত হয়।
পুলিশ জানান, ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে শামীমের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি আবার একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গত ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তত ১২০টি মাজারে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে কবর থেকে লাশ তুলে রাস্তায় এনে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে রাজবাড়িতে। এসব ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত ও এনসিপি সহ উগ্রবাদী জনতা অংশ নেয় এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশ হামলা থামাতে ব্যর্থ হয়।
কী ঘটেছিল?
রোববার বেলা ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে শতাধিক মানুষ দেশীয় লাঠিসোঁটা, রড ও চাপাতি নিয়ে দরবারে হামলা চালায়। তাদের মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীও ছিল। হামলাকারীরা দরবারের গেট ভেঙে ভিতরে ঢোকে, দোতলায় পীর আবদুর রহমানের ঘরের দরজা ভেঙে তাঁকে টেনে বের করে এলোপাতাড়ি মারধর করে।
দরবারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন পীরের ভক্ত জামিরন। তিনি বলেন: “দুপুরের দিকে দেখি বেশ কয়েকজন রড-লাঠি নিয়ে মিছিল করে আসছে। তারা গেট ভাঙচুর করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে। বাবাকে গলা ধরে টেনে বের করে রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। নিচে নামিয়ে একজন বলে, ‘বাইচে আছেরে এখনো, মারেক’।”
জামিরন জানান, পীরকে বের করার সময় তিনি হাতজোড় করে কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ শোনেনি। মাথা, মুখ ও নাকে রডের কোপ খেয়ে তিনি শুধু একবার “ইয়া মুরশিদ” বলতে পেরেছিলেন। হামলার সময় জামিরনের ডান হাতের আঙুলে আঘাত লাগে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন
রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম জানান, নিহত পীর আবদুর রহমানের মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি এলোপাতাড়ি কোপের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
শরীরের অন্যান্য স্থানেও জখম ছিল। মূলত মুখমণ্ডলের আঘাতজনিত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশের অবস্থান
খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, ধর্ম অবমাননা যেমন অন্যায়, তেমনি হত্যা, হামলা ও ভাঙচুরও অন্যায়। আইন অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ছড়ানো সাতটি আইডির মধ্যে দু-একটির অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। হামলায় জড়িত ১৫-১৮ জনকেও শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে দরবার এলাকায় অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং বিজিবির একটি দলও পরিদর্শন করেছে।
নিহত পীরের ভক্ত-অনুসারীরা সকাল থেকে দরবারে ছুটে আসছেন এবং ভাঙচুরের দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তাঁরা বলছেন, পীর অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। কোনো অন্যায় থাকলে আইনের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত ছিল।