রোমে মার্কিন দূতাবাসের অবস্থান ইতালির সাবেক এক রানির বাসভবন— পালাজ্জো মার্গারিটা প্রাসাদে।
তবে এ বছর দূতাবাসের সব বড় আয়োজন চলে ‘বোর্ডওয়াক’ নামে ১১৭ মিটার দীর্ঘ বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে।
সেগুন কাঠের ডেক, দুটি হেলিপ্যাড, একাধিক সুইমিং পুল, স্পা ও গলফের পাটিং গ্রিনসমৃদ্ধ এ প্রমোদতরীর মূল্য ৪৫ কোটি ডলার।
এর মালিক টেক্সাসের ধনকুবের এবং রিপাবলিকান পার্টির অর্ধদাতাদের একজন—টিলম্যান ফের্টিটা, যাকে ইতালিতে মার্কিন দূত বানিয়ে পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি এই গ্রীষ্মে ইতালির উপকূল ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ প্রমোদতরীতে চড়ে।
ইতোমধ্যে প্রমোদতরীটি নোঙর করেছে সিসিলির সেফালু, সোরেন্তো, এটনা পর্বতের পাদদেশ আর ভেনিসের আতশবাজির আলোতে।
এই প্রমোদতরীতেই সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন অঙ্গনের তারকাদের। খোদাই করে ‘ফ্রিডম ২৫০’ লেখা শ্যাম্পেনের গ্লাসে পানীয় উপভোগ করেছেন অতিথিরা।
এর মধ্যে নেপলসের এক অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন শহরের মেয়র, কাম্পানিয়া অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট এবং নেপলস ফুটবল ক্লাবের মালিক।
আর ভেনিসে প্রমোদতরীটির যখন প্রবেশ করে, তখন হেলিকপ্টার ও ছাদে অবস্থান নিয়ে কঠোর নজরদারির দায়িত্বে রাখা হয়েছিল স্নাইপারদের।
ওই সময় সেখানে ধনকুবেরদের এ বিলাসিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছিলেন একদল মানুষ।
ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘বোর্ডওয়াক’ এক অর্থে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবনের সম্প্রসারিত ভাসমান সংস্করণ হয়ে উঠেছে। এটি মার্কিন কূটনীতির পরিবর্তিত রূপও তুলে ধরে।
একসময় রাষ্ট্রদূতরা রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রকাশ করতেন প্রতিষ্ঠান, নিয়মকানুন ও কূটনৈতিক প্রটোকলের মাধ্যমে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সময় ব্যক্তিগত সম্পদ ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফের্টিটার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, ক্যাসিনো, হোটেল এবং বাস্কেটবলের টিম ‘হিউস্টন রকেটস’।
ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আবাস ‘মার-আ-লাগো’ যেমন কারো কারো দৃষ্টিতে হয়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক হোয়াইট হাউস, তেমনি ‘বোর্ডওয়াক’ প্রমোদতরীও রূপ নিয়েছে মার্কিন দূতাবাসে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেশাদার কূটনীতিকদের পরিবর্তে বড় অর্থদাতাদের রাষ্ট্রদূত বানানো নতুন কিছু নয়।
রাষ্ট্রদূত নিয়োগ নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক রায়ান স্কোভিল বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগই এ ধরনের রাষ্ট্রদূতের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে অনেক সমালোচক মনে করেন, রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকেরই প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকে না। ফলে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ পর্যন্ত পেশাদার কূটনীতিকদেরই করতে হয়।
নেটোতে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত স্যার এমির জোনস প্যারি বলেন, “একজন রাষ্ট্রদূত বিচক্ষণ হলে অনেক কম প্রচারে থাকতেন; কখনোই নিজের সম্পদ দেখিয়ে বেড়াতেন না।”
অনেকের কাছে এ ধরনের সমালোচনা এখন পুরোনো ধ্যানধারণা বলে মনে হতে পারে।
ফের্টিটার প্রশংসা করে ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, ইরান ও পোপকে ঘিরে মতবিরোধের পর ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ফের্টিটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তবে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির সংসদ সদস্য লিয়া কোয়ার্তাপেল্লে প্রশ্ন তুলেছেন, যখন ইতালির অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছেন, তখন এমন বিপুল সম্পদের প্রকাশ্য প্রদর্শন আদৌ কার্যকর কূটনীতি হতে পারে কিনা?
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। তবে এখনও ফের্টিটার বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে পা ফেলেননি।