অর্থমন্ত্রীঃ ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে

by নিজস্ব প্রতিবেদক
Published: Updated:

২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং বিশ্বমঞ্চে উন্নত ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সরকারের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, “সবার সহযোগিতায় একটি টেকসই, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা এবং বিশ্বে উন্নত ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।”

অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬)-এর বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন (দ্বিতীয় প্রান্তিক) উপস্থাপনকালে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, অর্থনীতিকে উদারীকরণ ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, ব্যবসা সহজীকরণ এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, “একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা ও প্রযুক্তি নির্ভর উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।”

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। “এসব পদক্ষেপ আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বাড়াবে, যা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।”

আরো পড়ুনঃ পেপ্যাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, সংসদে প্রধানমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে স্বাধীনতার চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ধারণ করে এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষা ও নেতৃত্বের প্রেরণায় দেশ সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্ব ও দূরদর্শী কর্মসূচি এই অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।

তিনি আরও বলেন, একটি সহনশীল, সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ধারাবাহিক সংস্কার, কার্যকর সুশাসন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর পূর্বাভাস তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল থাকবে এবং ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা মধ্যমেয়াদে প্রায় ৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে।

তিনি বলেন, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল এশীয় অর্থনীতিগুলো প্রায় ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে থাকবে, অন্যদিকে উন্নত অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় ১.৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে ৮.৭ শতাংশে পৌঁছানো বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালে ৪.২ শতাংশে এবং ২০২৬ সালে ৩.৮ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস রয়েছে। চীন ও ভারতের মতো প্রধান আমদানিকারক দেশের মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যচাপ কিছুটা কমতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এই ইতিবাচক পূর্বাভাসকে ব্যাহত করতে পারে।

আরো পড়ুনঃ ‘এস আলম ও বেক্সিমকোর পাচারকৃত সম্পদ ফেরত আনতে কাজ চলছে’

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানি ও সারমূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

দেশীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাইু-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণ ১৩.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪.৭ শতাংশ। সরকারি ব্যয় বেড়েছে ১৪.১ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মোট বরাদ্দের ১৩.৫৬ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩.১৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬.২২ বিলিয়ন ডলার।

মন্ত্রী আরও বলেন, মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১০.৩৪ শতাংশ।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, সাশ্রয়ী সরকারি ব্যয় এবং সহায়ক রাজস্ব নীতির মাধ্যমে চলতি অর্থবছরের শেষে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আগামীতে মূল্যস্ফীতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭.৫ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৬ শতাংশে নামার পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আরো পড়ুনঃ ৫২ দিনে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা পার হওয়ায় রুমিন ফারহানার উদ্বেগ

মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে সুরক্ষাবাদ, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় সরকার বিনিয়োগ ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

তিনি বলেন, “নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা, জমি ও জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর অধীনে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

আর্থিক খাতে সুশাসন জোরদার, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।

অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বৃহৎ ও কর্মক্ষম জনশক্তি এবং সম্প্রসারিত শিল্প সক্ষমতার মতো দেশের শক্তিশালী ভিত্তি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেবে।

You may also like