রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি জুনের মধ্যে ছাড় করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তার পরিবর্তে অতিরিক্ত শর্তসহ একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
এ পরিস্থিতিতে আইএমএফের নির্ধারিত পরবর্তী ঋণ কিস্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত শুধু অর্থপ্রবাহে সাময়িক বিঘ্ন নয়, দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার অগ্রগতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে, খবর কালের কন্ঠ-এর।
এমন এক সময় এই সিদ্ধান্ত এলো, যখন জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং নির্বাচনের পর অর্থনৈতিক প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে সরকার জটিল এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
ওয়াশিংটন ডিসিতে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ওই কর্মকর্তা জানান, গত দুই দিনের বৈঠকে আইএমএফ স্পষ্ট করে দিয়েছে, চলমান ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অধীনে জুনে প্রত্যাশিত ১৩০ কোটি ডলারের কিস্তি দেবে না সংস্থাটি।
বর্তমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ এখনো মোট ১৮৬ কোটি ডলার পাওয়ার কথা, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।
এর আগেও গত ডিসেম্বরে একটি কিস্তি পাওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তা স্থগিত রাখা হয়। বাংলাদেশ আশা করেছিল, ডিসেম্বর ও জুন দুই কিস্তি মিলিয়ে ১৩০ কোটি ডলার পাওয়া যাবে। কিন্তু সংস্থাটির সাম্প্রতিক অবস্থানে সেই সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আরো পড়ুনঃ আশিক চৌধুরীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
সংস্কারে পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ
আইএমএফের আপত্তির মূল জায়গা চারটি। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর ধীরগতি এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু না করা।
আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় গত তিন বছরে আরো কমেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, রাজস্ব খাতে বড় ধরনের সংস্কার এখন জরুরি। চুক্তি অনুযায়ী করছাড় কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর কথা থাকলেও বাস্তবে কর-জিডিপি অনুপাত হ্রাস পেয়েছে।
এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা
ব্যাংকিং খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়াও আইএমএফের অসন্তোষের বড় কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নীতিগত কিছু পদক্ষেপ উল্টো ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা কমছে।
আরো পড়ুনঃ হজ ফ্লাইট উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, খরচ কমানোর আশ্বাস
ভর্তুকি ও বিনিময় হার নিয়ে দ্বিধা
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ক্ষেত্রে ধীরগতি স্পষ্ট। যদিও অতীতে কয়েক দফা দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তা থমকে আছে। ফলে আইএমএফ মনে করছে, প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও নীতিগত দ্বিধা রয়েছে।
জ্বালানি ব্যয় ও বৈদেশিক চাপ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর আর্থিক চাপ আরো বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ শর্তে অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
নতুন কর্মসূচির ইঙ্গিত
আইএমএফ বর্তমান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পরিবর্তে নতুন শর্তে নতুন ঋণ চুক্তির দিকে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে আরো কঠোর শর্ত আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়ন কার্যত থেমে ছিল। ফলে সংস্থাটি এখন অসন্তুষ্ট হয়ে পিছু হটছে। সরকারের সামনে এখন দুটি পথ—আইএমএফের সব শর্ত মেনে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া, অথবা তা প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি থেকে সরে আসা।”