অ্যান্ডি বার্নহাম’ই কি যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?

Share

ব্রিটিশ রাজনীতিতে কয়েক দশক কাটানোর পর অ্যান্ডি বার্নহাম এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদ- প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের আরও কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন।

সোমবার (২২ জুন) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটির ক্ষমতাসীন লেবার পার্টিতে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই নেতৃত্ব নির্বাচন শুধু দলকেই নয়, বরং যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাকেও নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা নাম হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম।

স্টারমারের পদত্যাগের পেছনে ছিল একের পর এক রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও স্থানীয় নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে লেবার পার্টির প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ দাবি করেন।

উত্তর ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বার্নহাম পুনরায় সংসদে ফেরার পর পরিবর্তনের দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

আগামী জুলাইয়ে নতুন লেবার নেতা নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে বার্নহাম ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নিজের প্রার্থিতা জমা দেবেন।

ওয়েস্টমিনস্টার থেকে ম্যানচেস্টার, তারপর আবার জাতীয় রাজনীতিতে

ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লিভারপুল ও ম্যানচেস্টারের মধ্যবর্তী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন অ্যান্ডি বার্নহাম। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ টেলিকমের একজন প্রকৌশলী এবং মা ছিলেন একজন রিসেপশনিস্ট।

কৈশোরেই তিনি লেবার পার্টিতে যোগ দেন। পরে তিনি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।

বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী বার্নহাম ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আমলে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক পদোন্নতি লাভ করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।

তবে মন্ত্রিত্বের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি দুইবার লেবার পার্টির নেতৃত্বের দৌড়ে পরাজিত হন। ২০১০ ও ২০১৫ সালে দলীয় নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি।

এরপর ২০১৭ সালে তিনি জাতীয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র নির্বাচিত হন। এই সিদ্ধান্তই তার রাজনৈতিক পরিচয়কে নতুনভাবে গড়ে দেয়।

টানা তিন মেয়াদে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ম্যানচেস্টারের নগর পুনর্গঠন প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন। পাশাপাশি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বি নেটওয়ার্ক’ নামে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে স্থানীয় প্রশাসনের জন্য আরও বেশি ক্ষমতা আদায়ের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।

এর ফলে তিনি ‘কিং অব দ্য নর্থ’ উপাধিও পান। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ গেম অব থ্রোনস-এর অনুপ্রেরণায় দেওয়া এই উপাধি তার নিজ অঞ্চলের প্রতি সমর্থন এবং জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের প্রচারণায় বার্নহাম বলেন, গ্রেটার ম্যানচেস্টারে আমরা যা গড়ে তুলেছি, সেটিকে এখন জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি কম বিদ্যুৎ বিল, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও তরুণদের জন্য আরও ভালো কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেন।

বার্নহামের ভাষায়, আমি জানি কীভাবে কোনো অঞ্চলকে বদলে দিতে হয়।

তার রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ‘ট্রিকল-ডাউন ইকোনমিকস’ বা ওপর থেকে নিচে অর্থনৈতিক সুবিধা পৌঁছানোর তত্ত্বের বিরোধিতা। তার দাবি, এই নীতি লন্ডনের বাইরে বসবাসকারী মানুষের জন্য কার্যকর হয়নি।

এছাড়া ১৯৮৯ সালে শেফিল্ডে এক ফুটবল ম্যাচে পদদলিত হয়ে নিহত ৯৭ জন লিভারপুল সমর্থকের জন্য ন্যায়বিচারের আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় সমর্থন দেন।

বছরের পর বছর নিহতদের পরিবারের আন্দোলনের ফলে পুলিশের ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের বিষয়টি সামনে আসে। একই সঙ্গে সরকারকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।

জনপ্রিয়তা আছে, তবে প্রশ্নও রয়েছে

বার্নহামের জনপ্রিয়তার পেছনে তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্যুট-টাইয়ের বদলে খোলা গলার শার্ট ও জিন্স পরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। অবসরে ফুটবল খেলেন ও ১৯৯০-এর দশকের গান নিয়ে ডিজে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

তার সমর্থকদের মতে, তিনি একজন দক্ষ বক্তা ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন।

মেকারফিল্ডের ৬৬ বছর বয়সী ভোটার এলেন পিকটন বলেন, বার্নহামের জয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত। আমি বিশ্বাস করি, তিনি সাধারণ মানুষের নেতা। তিনি আরও বলেন, অ্যান্ডি আমাদেরই একজন। তিনি আমাদের সমস্যাগুলো বোঝেন।

লেবার পার্টির অনেকের কাছে বার্নহাম এমন একজন নেতা, যিনি বিশেষ করে লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাইরে দল থেকে দূরে সরে যাওয়া ভোটারদের আবার ফিরিয়ে আনতে পারেন।

তবে তার সমালোচকরাও কম নন। তাদের দাবি, তার নীতিগত পরিকল্পনায় অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। বিশেষ করে, উচ্চাভিলাষী ব্যয়ের পরিকল্পনার অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না।

আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, গ্রেটার ম্যানচেস্টারে তার সাফল্য কি পুরো যুক্তরাজ্যে একইভাবে কার্যকর হবে?

লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক টিম বেল বলেন, বার্নহামকে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বলা হলে প্রশ্ন আসে- তিনি কি দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমেরও রাজা হতে পারবেন?

তবে তিনি আরও বলেন, তার মধ্যে এমন একটি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে যা মানুষকে ভাবায় যে তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ নন। তিনি সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারেন।

সবকিছু মিলিয়ে বার্নহাম বর্তমানে এমন এক রাজনৈতিক গতি অর্জন করেছেন, যা তাকে শেষ পর্যন্ত ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছে দিতে পারে।

টিম বেলের ভাষায়, অ্যান্ডি বার্নহাম সম্ভবত বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের একজন। যদিও সত্যি বলতে গেলে, সেটি খুব বড় কিছু বলাও নয়।

এখন সবার নজর লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকে। অনেক সংসদ সদস্য চাইছেন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই বার্নহামকে নেতা করা হোক। তবে শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো প্রার্থী মাঠে নামবেন কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Related Articles

অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা

ম্যাচের প্রথমার্ধে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধেও...

অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ফটিকছড়িতে ভারতীয় নাগরিক আটক

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভূজপুর সীমান্ত এলাকা থেকে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করেছে বর্ডার...

বিদায়ের আগে ডিসি সারওয়ারের চমক

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা খুলে দিয়েছেন...

অপতথ্য প্রচার করা ৪০০ সোশ্যাল অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের অনুকরণে...