দেশে জাল মুদ্রা প্রস্তুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, মজুত ও পাচারসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য অপরাধ দমনে স্বতন্ত্র আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে।
প্রস্তাবিত আইনে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্জিত সম্পদের অর্থমূল্যের দ্বিগুণ বা ন্যূনতম এক কোটি টাকা, যেটি বেশি তা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার বিধান থাকছে।
দেশে প্রচলিত মুদ্রার আদলে জাল মুদ্রা প্রস্তুত, ধারণ, কেনাবেচা, ব্যবহার, মজুত, পরিবহন, সরবরাহ ও সহায়তাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং বৈধ মুদ্রা ব্যবহারে আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নতুন আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও এই আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে। অন্য আইনের কোনো বিধান যদি এ আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ অকার্যকর বলে গণ্য হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ জাল নোট ছড়িয়ে পড়লে তা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তাই জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোর হওয়া উচিত। তবে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
আইনের খসড়া অনুযায়ী, জাল মুদ্রা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটি’ গঠন করা হবে। কমিটির গঠন ও কার্যাবলি প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক জাল মুদ্রার বাহক, সরবরাহকারী, প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী ও মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ-সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার স্থাপন ও পরিচালনা করবে। আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত বা মামলার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সরবরাহ করবে। এসব তথ্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটিকে সরবরাহ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নির্ধারিত পদ্ধতিতে এসব তথ্য ব্যবহার করতে পারবে।
খসড়ায় জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত একাধিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মুদ্রা জাল করা বা জাল করার প্রক্রিয়ার যে কোনো অংশে অংশগ্রহণ এবং জাল মুদ্রা জেনেশুনে মজুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, গ্রহণ বা আসল মুদ্রা হিসেবে লেনদেন করা।
এছাড়া জাল মুদ্রা তৈরির উদ্দেশ্যে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা উপকরণ প্রস্তুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি, বহন বা দখলে রাখা। জাল মুদ্রা তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন বা সেই তথ্য আদান-প্রদান এবং এ-সংক্রান্ত ফাইল, অডিও, ভিডিও, সফটকপি, হার্ডকপি বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অবৈধ উদ্দেশ্যে সংরক্ষণও অপরাধ বলে গণ্য হবে।
সেই সঙ্গে অপরাধ হবে- বিদেশ থেকে দেশে বা দেশ থেকে বিদেশে জাল মুদ্রা সরবরাহ, পরিবহন বা পাচার। ব্লিচড, টেম্পার্ড ও মিসম্যাচড মুদ্রা কেনাবেচা, ব্যবহার, লেনদেন বা দখলে রাখা। এমন মুদ্রাসদৃশ বস্তু বা দলিল তৈরি করা, যা জাল করার উদ্দেশ্যে না হলেও অন্য কাউকে প্রতারিত করতে পারে।
খসড়া অনুযায়ী, পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা ও কোস্ট গার্ডের পেটি অফিসার বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা যৌক্তিক সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো স্থানে পরোয়ানা ছাড়াই প্রবেশ, পরিদর্শন ও তল্লাশি চালাতে পারবেন।
তল্লাশির সময় জাল মুদ্রা প্রস্তুত, মজুত, বিপণন বা পরিবহনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে। একই সঙ্গে জাল মুদ্রা, এগুলো লেনদেন থেকে পাওয়া বৈধ দেশি-বিদেশি মুদ্রা, চেকবই, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, কম্পিউটার, স্ক্যানার, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, কাগজ, কালি, রাসায়নিক দ্রব্যসহ সংশ্লিষ্ট উপকরণ জব্দ করা যাবে। পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা গ্রেফতার বা জব্দ করলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করতে হবে।
এ বিষয়ে কথা হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাল মুদ্রা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। তবে শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই হবে না, আইনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, খসড়া আইনে যদি জাল মুদ্রা সংরক্ষণ বা এ-সংক্রান্ত ব্যবসায় জড়িত থাকার জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়, তাহলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলকভাবে আইনটি বাস্তবায়ন করা গেলে এ ধরনের অপরাধ ধীরে ধীরে কমে আসবে। কারণ, জাল মুদ্রার ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। এর সঙ্গে প্রায়ই কালোবাজারি, অর্থপাচার, এমনকি মানবপাচারের মতো আরও বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র থাকে। ফলে এ অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিধান প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান আহ্বান জানান, এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রচলিত আইনি বিধান মেনে কাজ করতে হবে এবং গ্রেফতারের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করার মতো সাংবিধানিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। অপরাধ দমনে কঠোরতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রক্রিয়ায় যেন কোনোভাবেই নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।