বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। এর কোনো পিতার প্রয়োজন ছিল না”: অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে লেখক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মনে করেন, পাকিস্তানি চিন্তাধারা আমাদেরকে এখনো ‘বশ’ করে রেখেছে।
নবতিপর এই শিক্ষকের উপলব্ধি, মুনাফা অর্জনের যে সংস্কৃতি সমাজকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ‘ধ্বংস করেছে’ তা থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তিমালিকানাকে বাদ দিয়ে ‘সামাজিক মালিকানা’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
“পুঁজিবাদের বিকাশে সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক, যা আজ বিশ্বকে এক করুণ অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। তাই, এ সমাজকে বাঁচাতে হলে পুঁজিবাদকে নস্যাৎ করতে হবে।”
মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে নিজের জন্মদিনের আয়োজনে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার দেখা নানা ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা দেন।
রাজনীতি ও সাহিত্যের পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’ পরিবার আয়োজিত ‘কি দেখেছি কি বুঝেছি’ শিরোনামের আত্মজৈবনিক একক বক্তৃতায় ৯১ এ পা রাখা এই প্রাবন্ধিক ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন আমলের দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করেন।
সে সময় কিশোর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেখেছেন খাদ্যাভাবে মানুষের মৃত্যু। তখনকার একটি ঘটনা বর্ণনায় তিনি বলেন, “আমরা একদিন রাজশাহীতে যাই এবং রাজশাহীতে আমার মা হঠাৎ দেখে যে আমার মাকে যিনি সাহায্য করতেন এমন এক স্থানীয় মহিলা একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। সেই শিশু কাঁদছে, কোনো কথা বলতে পারছে না।
“পরিচয় নাই, ফ্রক পরা এবং ওই যিনি নিয়ে এসেছেন তিনি যে বললেন, একে ওই জঙ্গলের সামনে হয়তো তার বাবা মা রেখে দিয়ে চলে গেছে। ওই মহিলা বললেন আপনি কি নেবেন? মা বললেন, নেব। তো তিনি ওই মেয়েটি আমাদের সাথেই থাকল।”
কুড়িয়ে পাওয়ায় তার নাম কুড়ানি রাখার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই মেয়েটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে অবসর নেওয়া সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “তো এই একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে দুর্ভিক্ষের ছবি দেখলাম, আজকেও বাংলাদেশে ওই শিশুদের মধ্যে সেই করুণ অবস্থা। এইসময় সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তার উপর অন্য কোনো অত্যাচার হয় নাই, কিন্তু আজকের শিশুরা কীভাবে ধর্ষিত, কীভাবে ধর্ষণের পরে তাকে হত্যা করা হচ্ছে।
“এই যে আমাদের ৭০ বছরের অগ্রগতি, সেটা সেদিনের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। উপর কাঠামোতে তার বস্তুগতভাবে চেহারায় বা দালান কোটায়, রাস্তাঘাটে প্রচুর উন্নতি হয়েছে। গত ৭০ বছরের ধারাবাহিকতা এটা।”
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন আমলে দুর্ভিক্ষের আরেকটি ঘটনা তুলে ধরে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, “হঠাৎ করে আমরা শুনলাম, একজন মানুষ আত্মহত্যা করেছে এবং আমরা সেই শিশুরা দৌড়ে গিয়ে দেখলাম যে মানুষটা গাছের থেকে ঝুলছে। আমরা যে মেলাতে পুতুল খেলা দেখেছি এরকম পুতুলের মত নড়ছে। কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করেছেন অভাবের কারণে।
“শুধু একজন নয়, এরকম পর পর এক পরিবারে তিনজন মা-বাবা-মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। যেখানে সেই সময় ক্ষুদ্র ঋণে জড়িয়ে পরিশোধ করতে না পেরে তারা এ কাজ করেছেন। যার প্রতিচ্ছবি আজকের বাংলাদেশ। আজকে বাংলাদেশে সবাই ঋণ নিচ্ছে। সেই ঋণ পরিশোধ করে আবার ঋণ নেওয়ার সেই পুঁজিবাদী মানসিকতা আজ মানুষের রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।”
জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্য দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে রাখার কথা তুলে ধরে এই এমেরিটাস অধ্যাপক বলেন, “১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগ হল, তখন জিন্নাহ বুঝে গিয়েছিলেন, জাতীয়তাবাদ ও জাতির মূল ভিত্তি হচ্ছে ভাষা। তাই, ১৯৪৮ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে আসলেন; তিনি বললেন, উর্দুই হবে একমাত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। যার মধ্যদিয়ে তিনি বাংলা ও পাকিস্তানকে এক করতে চেয়েছিলেন।
“তিনি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা বলেই পাকিস্তান আন্দোলনে ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ধর্মতে যে কুলাবে না, এটা বুঝে তিনি ভাষাকে আনতে চাইলেন এবং উর্দুর মাধ্যমে একটা জাতীয় ঐক্য তৈরি করবেন। একটা জাতি তৈরি করবেন। ওই যে তিনি বলেছিলেন গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে যে এখন থেকেই ধর্মীয়ভাবে আমরা থাকি, যাই হই রাজনৈতিকভাবে আমরা হিন্দু বা মুসলমান নই, পাঞ্জাবি বা বাঙালি নই আমরা সবাই পাকিস্তানি একটা জাতি তৈরি করবেন এবং সেই জাতি তৈরি হবে ভাষার ভিত্তিতে।
“এই ধারণাটাই কিন্তু আইয়ুব খান, ওই ধারণা নিয়েই কাজ করছিলেন। কিন্তু সেটা হয়নি, একটা ভাষা তৈরি করা যায়নি অথবা একটা যে একটা লিপি দিয়ে সমস্ত ভাষাকে এক করার যে চেষ্টা সেই সফল হয়নি।”
সেই পাকিস্তানি চিন্তাধারা আমাদেরকে এখনো ‘বশ’ করে রেখেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও কেন আমাদের সেই ধারণার মধ্য থাকতে হবে। ১৯৪৭ সালেও এদেশে ১৭টি জাতি ছিল। যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি সবই আলাদা ছিল।” আজকে কেন সবাইকে এক করতে হবে সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এই লেখক বলেন, পাকিস্তানে যেমন জিন্নাহকে কেন্দ্র করে জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিল, বাংলাদেশেও একইভাবে ‘জাতির পিতা’ ধারণাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাকেও একইভাবে জাতির পিতা বানানো হয়েছে।
তার ভাষায়, “বাংলাদেশ তো ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর সৃষ্টি হয়নি, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। এর কোনো পিতার প্রয়োজন ছিল না।”
বর্তমান বিশ্বে এনজিওগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, “৫০ ও ৬০ এর দশকে খ্রিষ্টান মিশনারিরা বিভিন্ন দেশে যেতেন তাদের ধর্ম প্রচার করতে। কিন্তু তারা ধর্মের নামে সেখানে মানুষকে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে এক চিন্তা তৈরি করতে কাজ করতেন। যা বর্তমানে এনজিওগুলো করছে। তারা ধর্ম বলতে পুঁজিবাদী ধর্মের প্রচার করছে।”
তার মতে, “১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়েছে, সমাজ দু’ভাগে বিভক্ত। যেখানে ৯০ জন শোষিত, আর বাকি ১০ জন শোষক। যা আজকের বিশ্বে ৯৯ জন শোষিত ও একজন শোষকে পরিণত হয়েছে। সেই শোষণের শৃঙ্খল ভাঙ্গতে হলে ব্যক্তিমালিকানার বিরুদ্ধে এক হলে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতি করেন এ এস এম কামাল উদ্দিন।
বরেণ্য এই শিক্ষকের ৯১তম জন্মদিনে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, উদীচী, ছাত্র কাউন্সিল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, মওলানা ভাসানী পরিষদ, গ্রিন ভয়েস, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য, প্রাচ্যনাট ও সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘসহ নানা সংগঠন।
বক্তৃতা পর্ব শেষে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পীরা।