স্বজন-দর্শনার্থীতে ঠাসা বিমানবন্দরের ক্যানোপি, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

Share

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ এর ক্যানোপিতে নিয়মিতই যাত্রীদের স্বজন, দর্শনার্থী, গাড়ির দালাল, সিএনজি চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অবাধ প্রবেশ ঘটছে। ফলে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্যানোপির প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে তারা এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীকে নিতে পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দরে আসতেই পারেন। তবে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের ক্যানোপির ভেতরে প্রবেশ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত এলাকায় এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তাই বিষয়টিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

আর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বলেন, ক্যানোপির গেটে নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছেন। তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে এত মানুষ ভেতরে প্রবেশ করছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগমনী টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ এর ক্যানোপির ভেতরে শত শত মানুষের ভিড়। কে যাত্রীর স্বজন, কে অন্য কোনও কাজে এসেছেন; তা বোঝার উপায় নেই। কোনও বাধা ছাড়াই মানুষ ক্যানোপিতে প্রবেশ ও বের হচ্ছেন।

দেখা যায়, যাত্রীর স্বজনদের পাশাপাশি গাড়ির দালাল, সিএনজি চালক, এমনকি বিমানবন্দর দেখতে আসা ব্যক্তিরাও ক্যানোপির ভেতরে অবস্থান করছেন।

টার্মিনাল ১-এ সোলাইমান নামে এক সিএনজি চালক এই প্রতিবেদককে জিজ্ঞেস করেন, সিএনজি লাগবে কি না। কীভাবে ভেতরে ঢুকেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো প্রতিদিনই এখানে আসি। কেউ তো কিছু বলে না।’ বিমানবন্দরে এলে বাড়তি ভাড়া পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।

একইভাবে আমির হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানান, সন্ধ্যায় ট্রেনে রাজশাহী যাবেন। হাতে সময় থাকায় বিমানবন্দর দেখতে এসেছেন। ভেতরে প্রবেশের বিষয়ে কেউ বাধা দেয়নি বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, নিষেধ করলে তিনি ভেতরে আসতেন না।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, একজন প্রবাসীকে নিতে একজনের সঙ্গে চার থেকে পাঁচজন স্বজন এসেছেন এবং সবাই ক্যানোপির ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

লক্ষ্মীপুরের আব্দুল্লাহ তার ছেলেকে নিতে স্ত্রী, দুই সন্তান ও এক প্রতিবেশীকে নিয়ে এসেছেন। ক্যানোপি-১–এর এক কোণে তারা একসঙ্গে বসে ছিলেন। দুপুর ২টার পর ফ্লাইট অবতরণের কথা থাকলেও তারা সকাল ১১টা থেকেই সেখানে অবস্থান করছিলেন। মাঝেমধ্যে বাইরে গিয়ে আবার ভেতরে ফিরছিলেন।

আব্দুল্লাহ বলেন, বিমানবন্দরের নিয়ম সম্পর্কে তিনি জানেন না। দুজনের বেশি স্বজন প্রবেশ করতে পারবেন না—এ কথাও কেউ তাকে জানাননি।

নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়ন নেই

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিমানবন্দরের ক্যানোপি ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, প্রায় দুই বছর পার হলেও তা দূর হয়নি। অথচ বিমানবন্দরে একজন যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন সঙ্গী প্রবেশের বিধিনিষেধ রয়েছে।

বাস্তবে এ বিধিনিষেধের কোনও প্রয়োগ দেখা যায় না। এমনকি এটি বাস্তবায়নে বিমানবন্দরে দায়িত্বে থাকা কোনও সংস্থাকেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে একজন যাত্রীর সঙ্গে চার-পাঁচজন বা তারও বেশি স্বজন ক্যানোপিতে প্রবেশ করছেন। সেখানে শৃঙ্খলার কোনও চিহ্ন নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ২৭ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত ও বহির্গামী যাত্রীদের সঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন সঙ্গী প্রবেশ করতে পারবেন—মর্মে নির্দেশনা জারি করে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানবন্দরের ডিপারচার ড্রাইভওয়ে ও অ্যারাইভাল ক্যানোপিতে প্রতি যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন ব্যক্তি প্রবেশের অনুমতি পাবেন। যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, বিমানবন্দর এলাকায় আগত সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে চলাচল ও কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে। ঈদ, ছুটি বা শিক্ষাবর্ষ শেষে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগমনে বিমানবন্দরে বাড়তি ভিড় হয়। এমন পরিস্থিতিতে যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে এ পদক্ষেপ জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়। প্রয়োজনে নিয়ম আরও কঠোর করা হতে পারে বলেও জানানো হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র ও পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, এ নির্দেশনার বাস্তবায়নের কোনও চিত্র নেই। যদিও বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা বিধিনিষেধ সম্পর্কে অবগত। তাদের সামনেই একজন যাত্রীর সঙ্গে তিন-চারজন করে স্বজন ক্যানোপিতে প্রবেশ করছেন। আগমনী যাত্রীদের সঙ্গে গাড়িভর্তি লোকজনও ক্যানোপির ভেতরে উঠছেন। সবকিছু তাদের সামনেই ঘটলেও কাউকে কোনও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এতে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা

বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যানোপির ভেতরে এভাবে লোকজনের প্রবেশ মোটেও সমীচীন নয়। যাত্রী বাইরে এলে তার স্বজনদের মধ্যে একজন গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু দলে দলে মানুষের প্রবেশ নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

তাদের মতে, গেটে দায়িত্বে থাকা সদস্যদেরই এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রী ছাড়া অন্য কেউ যেন ভেতরে প্রবেশ না করেন, সেটি সবাইকে বুঝিয়ে বলতে হবে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কে নেবে—সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাবা উচিত।

গেটে দেখা যায়, আনসার ও এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন। মাঝে মধ্যে আনসার সদস্যদের নড়াচড়া করতে দেখা গেলেও এপিবিএন সদস্যরা বেশিরভাগ সময় বসেই থাকেন। কাউকে কিছু বলতেও দেখা যায় না। এমনকি গেটের সামনে গাড়ির জটলা থাকলেও সেদিকে তাদের তেমন নজর নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে কেউ কোনও নিয়ম মানতে চায় না। যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি আসা যাবে না—এটি আমরা জানি। কিন্তু বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন। লোকজনকে বললেও তারা কথা শোনে না। কিছু বললে উল্টো যাত্রী ও তাদের স্বজনরা হুমকি দেন।’

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, ‘বিমানবন্দরকে যত ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায়, ততই ভালো। নিরাপত্তা যত সুসংহত হবে, আমাদের ক্যাটাগরিও তত উন্নত হবে। ক্যানোপি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। ওই দুই গেট দিয়েই যাত্রীরা বের হন। তাই বিষয়টিতে সবারই মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত জনসাধারণকে ক্যানোপির ভেতরে না আসতে বলছি। কিন্তু তারা কথা শুনতে চান না। তারপরও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা সচেতন না হলে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন।’

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ বশির উদ্দীন বলেন, ‘বিমানবন্দরের ভেতরে ভবঘুরে, ভিক্ষুক, ছিনতাইকারী ও পকেটমারদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে যাত্রীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন স্বজন প্রবেশের নিয়মও আমরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। এরপরও বিষয়টি আমরা দেখবো।’

Related Articles

মালয়েশিয়ায় সহকর্মীদের মধ্যে মারামারি, ৩ বাংলাদেশি নিহত

মালয়েশিয়ায় সহকর্মীদের মধ্যে মারামারিতে ৩ বাংলাদেশি নিহত ও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।...

মুজাফফরের ‘সন্দেহজনক ফেইসবুক যোগাযোগ’, তথ্য চেয়ে মেটাকে চিঠি

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার...

রাশিয়ায় মোতায়েন হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট: ইউক্রেইন

উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মোতায়েন শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন...

যমুনা সেতু এলাকায় ৫৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে যমুনা সেতু...