নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মোহন সাত বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন পরিবারের সচ্ছলতার আশায়। রিয়াদ মহানগরীর শিফা থানারে মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকার একটি সোফা কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ভালই উপার্জন ছিল।
দুই বছর আগে ছোট ভাই সুমনকেও নিয়ে যান সেখানে। দুই ভাই একই কারখানায় কাজ করতেন। থাকতেনও একই জায়গায়। দুই ভাইয়ের উদয়াস্ত পরিশ্রমে পরিবারটি মাত্র ঋণের বোঝা মিটিয়ে একটি ভাল বাড়ি করার স্বপ্ন দেখছিল।
সেই স্বপ্নই রোববার পুড়ল আগুনে। সুমন ও মোহন সোফা কারখানায় লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
“আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কী সর্বনাশ হল বাবা আমার।”
দুই ছেলে নিহতের খবর শুনে গ্রামের লোকজন, আত্মীয়-স্বজন এসেছেন বাড়িতে বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু মোহন-সুমনের বাবা-মা আর বোনের আহাজারিতে তারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।
মোহন-সুমনের বোন আদরী বেগম বলছিলেন, ভাই (মোহন) রোববার দুপুর ১টার দিকে ফোন দিয়েছিলেন। ফোন ধরতে দেরি হওয়ায় রাগ করেছিল।
“আমার ভাইয়া আমাকে আর কোনোদিন ফোন দিবে না। আল্লাহ আমার দুই ভাইরে নিয়ে গেছে।”
সৌদি আরবের এই সোফা কারখানায় যে ১৬ বাংলাদেশি নিহতের খবর এসেছে, তার মধ্যে ১৩ জনই নওগাঁও আত্রাই উপজেলার। এর মধ্যে গন্ডগোহালা গ্রামেরই রয়েছেন চারজন।
মোহন ও সুমন ছাড়া বাকি দুজন হলেন- সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিম উদ্দিন।
পাশের পাড়ার কলিম উদ্দিনের বাড়িতে গিয়েও দেখা যায়, শোকের পরিবেশ। তার মা ছেলের ছবি বুকে নিয়ে অনবরত কেঁদে চলেছেন।
কলিম উদ্দিনের মা বলছিলেন, ছেলে এবার বাড়ি এসে বিয়ে করার কথা ছিল।
“কেবলমাত্র সুখের মুখ দেখতেই আবার দুঃখের সাগরে পড়লাম। আমি আমার সন্তানকে শেষবারের মত দেখতে চাই।”
নিহত চারজনের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরুজ্জামান বলেন, ১৩ নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। মরদেহ ফিরিয়ে আনতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। প্রত্যেকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সবার পরিচয় যাচাইসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। দুজনের বাড়ি পাশের নাটোর জেলার নলডাঙ্গায়। অপরজনের বাড়ি আত্রাই লাগোয়া রাজশাহীর বাগমারায়।
আত্রাইয়ের নিহতরা হলেন—উজনপই গ্রামের ফরিদ ,ডুবাই গ্রামের শুভ ও সুমন, গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, একই গ্রামের বজলুর প্রামানিকের ছেলে কলিমউদ্দিন, গুফফার প্রামানিকের ছেলে মোহন ও সুমন; একই থানার মিনহাজ, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, নওগাঁ গ্রামের শাহিন; খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল, একই গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল, সাদনগর গ্রামের সাগর।
নলডাঙ্গার দুজন হলেন—দিঘীরপাড় গ্রামের শামিম এবং খাজুরা গ্রামের সাকিব।
আর রাজশাহীর বাগমারার যিনি মারা গেছেন, সেই শ্যামলের বাড়ি মরুগ্রামে।