বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর আদায় ও পরিশোধের নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাই কোর্ট।
বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাই কোর্ট বেঞ্চ সোমবার এ রুল জারি করেন।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ আইন কমিশনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার। গত ৫ জুলাই তিনি জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষায় ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অধীনে একটি নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়।
রুল জারির বিষয়ে আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার বলেন, “আদালত জানতে চেয়েছেন, কেন ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অধীনে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে না, যেখানে বিয়ের তারিখ থেকে যুক্তিসংগত সময় পর পরিশোধযোগ্য দেনমোহর নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও আদায়ের পদ্ধতি, নীতি এবং প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে।
“দাম্পত্য জীবনে নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষা এবং শরিয়াহ আইনের আলোকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।”
দেনমোহরের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, “আইন ও ধর্ম অনুযায়ী বিয়ে একটি সিভিল কন্ট্রাক্ট এবং দেনমোহর হচ্ছে সেই চুক্তির কনসিডারেশন। বিয়ে হওয়ার সময় থেকেই দেনমোহর পরিশোধ স্বামীর আইনগত বাধ্যবাধকতা। এটি স্বামীর ওপর একটি ঋণ হিসেবেও বর্তায়।
“স্বামী মারা গেলেও স্ত্রী তার প্রাপ্য দেনমোহর স্বামীর সম্পত্তি থেকে আদায় করতে পারেন। একইভাবে, কোনো স্ত্রী যদি দেনমোহর আদায় করার আগেই মারা যান, তাহলে তার সেই দাবি বিলুপ্ত হয় না। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর বৈধ উত্তরাধিকারীরা স্বামীর কাছে মৃত স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর দাবি করতে পারবেন। প্রয়োজনে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে আইনগতভাবে ওই দেনমোহর আদায়ের অধিকারও তাদের রয়েছে। স্ত্রী জীবিত থাকলেও তিনি নিজে দেনমোহর আদায়ের জন্য মামলা করতে পারেন।”
টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, “দেনমোহর নির্ধারণ ও পরিশোধের সময়ের মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান তৈরি হলে টাকার প্রকৃত মূল্য কমে যায়। ফলে বৈবাহিক জীবনে নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে উদ্দেশ্য, তা ব্যাহত হয়। ধরা যাক, বিয়ের সময় ২ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হল। এর মধ্যে ১ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করা হল এবং বাকি ১ লাখ টাকা বিলম্বিত রাখা হল।
“২০ বছর পর তালাক হলে সেই ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও ২০ বছর আগের টাকার ক্রয়ক্ষমতা আর বর্তমানের সমান থাকে না। ফলে স্ত্রী তার প্রকৃত আর্থিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।”
ফাহমিদা আক্তার বলেন, “আদালত বলেছেন, আইন অনুযায়ী দেনমোহর মূলত ‘ডেফার্ড’ বা ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার বিষয় নয়। বরং বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার সময় কিংবা বিয়ের পরপরই দেনমোহর পরিশোধ করা স্বামীর আইনগত বাধ্যবাধকতা।
“আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সামাজিক নানা কুপ্রথা ও প্রচলিত অনুশীলনের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেনমোহর সময়মত পরিশোধ করা হয় না। তাই এ বিষয়ে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, স্ত্রী সর্বাবস্থায় প্রাপ্য দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী এবং স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য।”