সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করছে বিএনপি সরকার।
এর আগের দরপত্রে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। তাই এবার নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তিতে (পিএসসি) বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে কিছু সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম। এতে দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহ বাড়তে পারে বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ, খবর প্রথম আলো’র।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, সর্বশেষ দরপত্রে সাতটি বিদেশি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনলেও কেউ জমা দেয়নি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জমা না দেওয়ার কারণ ও মতামত জেনে পিএসসি সংশোধন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন দিয়েছে। আজ রোববার দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
২০২৩ সালে মার্কিন কোম্পানি এক্সন মোবিল একাই সাগরের ২৬টি ব্লক চেয়েছিল, তবে দরপত্র ছাড়া সেসব ব্লক হস্তান্তর করতে রাজী হয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
আরো পড়ুনঃ শামা ওবায়েদঃ সামরিক চুক্তি হলে দেশের স্বার্থ রক্ষা করেই হবে
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তা বলেন, আগামী ১ জুন থেকে দরপত্রের প্রয়োজনীয় নথি কিনতে পারবেন আগ্রহীরা। একই সঙ্গে সমুদ্রে পরিচালিত জরিপের তথ্যও কিনতে পারবে তারা। দরপত্র কেনা ও জমা দিতে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হচ্ছে। ৫৫টি কোম্পানিকে সরাসরি মেইল করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পেট্রোবাংলা।
২০১২ সালে ভারতের সঙ্গে ও ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে সমুদ্রে বিরাট এলাকা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি মিলে মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয় বঙ্গোপসাগরকে। যদিও এর আগেই শুরু হয়ে যায় সমুদ্রে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান।
এ পর্যন্ত মোট চারটি কোম্পানি বিভিন্ন সময় অনুসন্ধান শুরু করলেও কাজ শেষ না করেই সবাই চলে গেছে। এখন সমুদ্রে কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে না। তাই ২৬টি ব্লকেই দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব প্রথম আলোকে বলেন, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশি কোম্পানির জন্য আকর্ষণীয় পিএসসি করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। এবার অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে ভালো সাড়া আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরো পড়ুনঃ ইউনূসের করা মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির বিরুদ্ধে ঢাকায় মশাল মিছিল
পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তা বলেন, আগামী ১ জুন থেকে দরপত্রের প্রয়োজনীয় নথি কিনতে পারবেন আগ্রহীরা। একই সঙ্গে সমুদ্রে পরিচালিত জরিপের তথ্যও কিনতে পারবে তারা। দরপত্র কেনা ও জমা দিতে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হচ্ছে। ৫৫টি কোম্পানিকে সরাসরি মেইল করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পেট্রোবাংলা।
বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম
পিএসসি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিএসসি-২০১৯ অনুসারে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম রাখা হয়েছিল গভীর সমুদ্রের জন্য সোয়া সাত মার্কিন ডলার; আর অগভীর সমুদ্রের জন্য দাম ধরা হয় সাড়ে পাঁচ ডলার। ২০২৩ সালের পিএসসিতে কোনো স্থির দাম নির্ধারণ না করে গভীর ও অগভীর দুই ক্ষেত্রেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) দামের ১০ শতাংশ ধরা হয়।
এবার পিএসসি-২০২৬–এ এটি বাড়িয়ে গভীর সমুদ্রে ১১ শতাংশ ও অগভীর সমুদ্রে সাড়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে বা বাড়লে আনুপাতিক হারে গ্যাসের দামও কমবে বা বাড়বে। প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার হলে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম হবে ১১ ডলার। তবে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য ব্রেন্টের দামের ক্ষেত্রে এবার উচ্চ সীমা ও নিম্ন সীমা নির্ধারণ করা হবে, যাতে গ্যাসের দাম খুব বেশি বাড়তে বা কমতে না পারে।
আরো পড়ুনঃ মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবি নাকচ করলেন উপদেষ্টা জাহেদ
চুক্তি অনুসারে সমুদ্র থেকে গ্যাস সরবরাহে পাইপলাইন করবে ঠিকাদারি কোম্পানি। এ পাইপলাইনের জন্য গ্যাসের মজুত, সরবরাহ ও খরচ মিলে একটি ট্যারিফ পাবে ঠিকাদারি সংস্থা। গত পিএসসিতে এ সুবিধা ছিল না। চুক্তিতে ঠিকাদার হিসেবে আসা বহুজাতিক কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মধ্যকার মুনাফা ভাগাভাগির সূত্রও বদল করা হয়েছে।
অনুসন্ধান ব্যর্থ হওয়ার পরও ঠিকাদার কাজ অব্যাহত রাখতে চাইলে তার মুনাফার অংশ ১ থেকে ২ শতাংশ বাড়তে পারে। এর আগে শ্রম আইন সংশোধন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিদেশি কোম্পানিকে একটি সুবিধা দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। শ্রমিক তহবিলে কোম্পানির মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়েছে। এটিও ঠিকাদারদের অংশগ্রহণে আগ্রহ বাড়াবে।
আগের কিছু সুবিধা এবারও থাকছে, যেমন কর ও শুল্ক অব্যাহতি থাকছে আমদানিতে। ঠিকাদারের হয়ে আয়কর দেবে পেট্রোবাংলা। গ্যাস পেট্রোবাংলা না কিনলে দেশের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে পারবে ঠিকাদার। দেশে চাহিদা না থাকলে করতে পারবে রপ্তানি। দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যেতে পারবে যেকোনো পক্ষ। অগভীর সমুদ্রে ১০ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স)।
আরো পড়ুনঃ স্পট মার্কেট থেকে ৩ কার্গো এলএনজি ও ৭০,০০০ টন সার কেনার সিদ্ধান্ত
আমদানিতে ঝোঁক ছিল বেশি
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাসের সংকট মেটাতে ২০১৮ সাল থেকেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানির দিকেই তাদের ঝোঁক বেশি ছিল। তাই সমুদ্রে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে ২০১৯ সালে নতুন পিএসসি করা হলেও দরপত্র ডাকা হয়নি।
এরপর তিন বছর সময় নিয়ে নতুন পিএসসি-২০২৩ চূড়ান্ত করা হয়। এর মধ্যে সমুদ্রে ১২ হাজার কিলোমিটার লাইন এলাকায় টিজিএস ও স্লামবার্জার মিলে পরিচালিত বহুমাত্রিক ভূকম্পন (টুডি) জরিপ চালিয়ে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। ২০২৪ সালের মার্চে দরপত্র আহ্বান করা হয়। আগস্টে পটপরিবর্তনের পর দরপত্র জমার মেয়াদ তিন মাস বাড়ায় অন্তর্বর্তী সরকার। এতে কেউ অংশ না নেওয়ায় নতুন করে আর দরপত্র ডাকেনি গত সরকার।